Breaking News
Home / রবিবারের আড্ডা / গল্প / রবিবারের ছোটগল্প

রবিবারের ছোটগল্প

সরীসৃপ- এক রাহীঙ্গা মেয়ের গল্প

দে ব শ্রী চ ক্র ব র্তী

ছোটগল্প

ছবি:প্রীতি দেব

আজ ভোলটেজ অন্যদিনের থেকে অনেকটাই কম, পাখাটা খুব আস্তে ঘুরছে। দীর্ঘ দিন ধরে এক ভাবে চলতে চলতে ক্লান্তি তার সারা শরীরকে অবশ করে রেখেছে। কলটাতে অনেক দিন তেল না পড়ায় একটা বিকট শব্দ ঘুরপাক খাচ্ছে সারা ঘরে। আজ সারা দিন বৃষ্টি পড়ছে। টিনের ছাদ থেকে বৃষ্টির জল দেওয়াল দিয়ে গড়িয়ে মেঝের ওপর এসে পড়ছে। ঘরময় একটা গুমোট স্যাতসেতে গন্ধ। কোন দিন এ-ঘরের দরজা কিংবা জানালা সেভাবে খোলা হয় না। দু এক মিনিটের জন্য দরজা খোলা হলেও তা বন্ধ হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে। একটা ভাঙ্গা চৌকির ওপর একটা ধুলোপড়া রঙ ওঠা জাজিমের ওপর বসে আছে সাবিনা। দেওয়ালে হেলান দিয়ে সে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে সামনের রং ওঠা সবুজ দেওয়ালের দিকে। দিনের পর দিন জল পড়ে দেওয়ালে নানা রকম রেখা চিত্র তৈরি হয়েছে। যেন কত নাম না জানা নদী। তার মাঝে খাবলা খাবলা রং ওঠা গর্তগুলো যেন এক একটা সবুজ দ্বীপ। পুরো দেওয়ালটাকে একটা দেশ বলে মনে হয়। সবুজ দেওয়াল যেন এক সবুজ দেশ। সাবিনার চারপাশে বাদলা পোকা ঘুরছে। এত পোকা এলো কোথা থেকে? ছাদের একপাশে অনেকটা ফাঁক, সেখান দিয়ে হয়তো এসে ঢুকেছে। ধিরে ধিরে পোকা আর সাবিনা একে অপরের সাথে একাত্ম হয়ে দেওয়ালের মানচিত্র বয়ে এগিয়ে চলল আলোর দিকে। টিমটিমে বাল্বের আলোর চারপাশে সামিল হচ্ছে সাবিনা আর পোকারা। ওদের সাদা ডানা ঝাপটে শরীরের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে সারা শরীর দিয়ে শুষে নিচ্ছে টিমটিমে বাল্বের উত্তাপ। সাবিনা ওর সাদা ওড়না মাথা থেকে সরিয়ে একবার ঝেড়ে নিলো। অনেক দিন পর আজ বেশ চনমনে লাগছে,দরজা খোলার একটা মৃদু শব্দ হল। পোকাদের মতন নিজের সাদা ওড়না ঢাকা হাত দুটো দুপাশে তুলে শাবিনা আড়মোড়া ভঙতে ভাঙতে তাকালো ডান দিকে দেওয়া দিয়ে বয়ে যাওয়া দুটি নদী খাদের মাঝের ঘন জঙ্গল ভেদ করে একটা লিকপিকে সরিসৃপ তার চার পা বেয়ে এগিয়ে আসছে ওর দিকে। সরিসৃপের জিভ লকলকিয়ে উঠছে তরতাজা চনমনে সাবিনার কচি সাদা দুটো ডানার মাঝে। খাদ্য আর খাদক মুখোমুখি। চৌকির ওপর জাজিমের ক্যাচক্যাচ শব্দ আর শিলিং ফ্যানের ক্যাচক্যাচ শব্দ মিলেমিশে একাকার হয় যায়। সাবিনা তাকিয়ে আছে মানচিত্রের দিকে। একটা ল্যাকপেকে সরীসৃপ তার জিভের লালা দিয়ে চেটেপুটে খাচ্ছে আশ্রিত বাদলা পোকাদের। ভাঙ্গা চৌকির খটখট শব্দ চার দেওয়ালে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসছে সাবিনার কানে। ঠিক যেন মেশিন গানের শব্দ। সাবিনা ইয়াসমিনের কালো ঘন চুল চৌকি থেকে মেঝের জলের ওপর দিয়ে গড়িয়ে এগিয়ে চলে সবুজ দেওয়ালের মানচিত্রের দিকে । তারপর কালো মেঘের মতন সারা দেওয়ালকে ঢেকে দেয় সেই দিনের মতন, যা সাবিনার মতন বহু মেয়ের জীবনের আব্রুকে ধুয়ে মুছে নিয়ে গেছিল সীমান্ত পারে।
সবুজ পাহাড় আর চিনডুইন নদীতে ঘেরা ছোট্ট গ্রাম ডোংরি। সূর্যাস্তের বেগুনি আভায় আবৃতা গ্রামের মসজিদের নামাজ সেরে বেরিয়ে আসছে গ্রামের মুরুব্বিরা। একদল সাদা পোশাক পরা মানুষ মসজিদের বাইরে এসে একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলো। সাদা টুপিতে ঢাকা মাথার নিচে কপালে দুটো ভাঁজ পড়ল। মাঝে একটা গর্ত আর দুই দিকে দুটো রাস্তা। সাদা পোশাক পরা মানুষরা দুটি ভাগে ভাগ হয়ে চলে গেলো গ্রামের দুই দিকে। কিছু দূর গিয়ে তারা পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখল নদীর ওপার থেকে কালো মেঘ এগিয়ে আসছে তাদের দিকে, সারা গ্রামটাকে প্রায় ঘিরে ফেলেছে মেঘ। না এখান থেকে আর মসজিদ দেখা যাচ্ছে না। সাদা পোশাক পরা মানুষের দল কেউ কারুকে আর দেখতে পেলো না। তারা আন্দাজ করল মসজিদের মাথায় একটা বজ্রপাত হল, যার আলোর ছটা এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। সাদা পোশাকের দুটি দল ছুট দিলো দুই দিকে। কিছুক্ষণ পর গ্রামের বাড়ির দরজাগুলো খটখট করে উঠলো। সাবিনার ভাইরা কিছুক্ষন আগে মাছ ধরে ফিরেছে, উঠানের এক কোনে বসে তারা জাল গোটাচ্ছে। সাবিনার মা ভাতের হাড়ি বসিয়েছে মাটির উনুনে। এমন সময় সাবিনার আব্বু আর ভাইরা ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিতেই ঘরের মধ্যে জ্বলন্ত কুপিটা নিভে গেল। কেউ কারুর মুখ দেখতে পাচ্ছিলনা। সবাই তাকিয় ছিল অন্ধকারের দিকে। মনে হল নদীর ওপার থেকে এক ঝড় এগিয়ে আসছে তাদের গ্রামের দিকে। এক সাথে গ্রামের বাড়ির দরজাগুলো কেপে উঠল খটখট শব্দে। অন্ধকার ঘরের দেওয়াল গুলো ফুটো হয়ে গেলো। ঘরের মধ্যে ধূসর রঙের ধোঁয়া এসে ঢুকছে। সাবিনার দুই ভাই মাটিতে পড়ে যেতেই আম্মি কেঁদে উঠল হায় আল্লা। মাটির উনুনের আলোয় সাবিনা দেখতে পাচ্ছে ওদের বাড়ির দরজা কাঁপছে। দরজা কাঁপার শব্দে সারা বাড়ি কাঁপতে লাগলো। সাবিনা ওদের ভাঙ্গা চৌকির নীচে ঢুকে যেতেই এক দমকা হাওয়ায় দরজাটা খুলে গেলো। কিছু দেখা যায় না , শুধু ধূসর আলো আর ধোয়া ভেঙ্গে কিছু বুটের আওয়াজ এগিয়ে আসছে। সারা ঘরময় বুটের শব্দ ঘুরে বেড়াচ্ছে। সাবিনা চৌকির নিচে। ওর চোখের সামনে দরজাটা খোলা, সাবিনা উঠানের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। উঠানের ডান দিক থেকে একটা শব্দ হল, সাবিনা এই শব্দ চেনে। এই শব্দ সে সিনেমাতে দেখেছে গুলি চললে কেমন শব্দ হয় ।গুলির সাথে সে শুনতে পেলো তার আব্বুর আর্তনাদ। মুখের সামনে একটা সার্চলাইট জ্বলে উঠল। মনে হল যেন অন্ধ হয়ে যাবে সে। চোখ বন্ধ করে মুখটা মেঝের ওপর গুজে উপুড় হয়ে বসে রইল সে। তারপর সাবিনা নিজের দুই হাতে টান অনুভব করল। সে দেখেছে ভাইরা যখন নদী থেকে মাছ ভর্তি জাল তোলে, ঠিক সেই ভাবে তাকে টানতেটানতে কারা যেন বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, সাবিনার সারা শরীর বৃষ্টির জলে ভিজে সেই জল টাপুরটুপুর শব্দে পড়ছে উঠানে জমে থাকা জলের ওপর। আম্মু ঘর থেকে আর্তনাদ করে উঠল, মেয়েটা যে বড় ছোট, ওকে ছেড়ে দাও। আম্মুর আর্তনাদ তীব্র থেকে তীব্রতর হতে হতে কখন যেন থেমে গেলো। এখন শুধু বৃষ্টির শব্দ আর সারা শরীর জুড়ে কিলবিল করছে সরীসৃপদের উপস্থিতি। সাপকে বড় ভয় করে সে , আম্মি বলতো, সাপে হাত না দিলে এ ভয় কোনো দিন যাবে না। সত্যি তার মন থেকে সরীসৃপের ভয় কোথায় যেন উধাউ হয়ে যায়। সাবিনা জ্ঞান হারায়, কতক্ষন যে এই ভাবে পড়েছিল তার মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরল তখন বৃষ্টি থেমে গেছে। গ্রামের চারপাশে জ্বলন্ত চিতার মতন জ্বলছে মানুষের ঘরবাড়ি। সাবিনা উঠানের মাঝে শুয়ে নিজের দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে দেখতে পেলো তাদের পরিবারের জ্বলন্ত চিতা। গ্রামের মানুষ লাইন দিয়ে রাতের অন্ধকারে চলেছে নদীর দিকে।
নদী ঘাটে হাজার হাজার মানুষ আর শ’ খানেক নৌকা। এক রাতের মধ্যে কত অচেনা মুখ কত আপন হয়ে যায়। ঝড়ে বিধ্বস্ত ডালপালা মেলা কত গুলো ছায়া এগিয়ে চলে একএকটি নৌকার দিকে। এক একটা নৌকা থেকে ভেসে আসছে অসহায় মানুষের আর্তনাদ। মাঝির দৃষ্টি সাবিনার গলার কাটা দাগের নিচে। এ দৃষ্টি চিনতে অসুবিধা হয় না তার। সাবিনা জামার বোতাম খুলে এগিয়ে যায় মাঝির দিকে। সাবিনার দুই পায়ের মাঝে এক নির্মম ধাক্কা, তারপর কিছুক্ষন নৌকা দুলতেদুলতে জোয়ারের টানে এগিয়ে চলে সমুদ্রের দিকে। নদীমাতৃক উপত্যকার সাবিনা যার বসবাস গৃহপালিত পশু আর নদীর চঞ্চল মাছেদের মাঝে, সে এগিয়ে চলে সমুদ্রের হিংস্র জীবজন্তুদের দিকে। এই ভাবে কত দীর্ঘ পথ তাকে উত্তীর্ন করতে হয়েছে তার মনে নেই। একেরপর এক নৌকা বদল হতে হতে বিবস্ত্র সাবিনার নৌকার চারধারে গজিয়ে ওঠে সবুজ দেওয়াল আর মাথার উপর টিনের চাল। কয়েক মূহুর্ত একা হওয়ার অনুভব সে পায়নি। কারন সরীসৃপের সাথে সহাবস্থান তার। নিত্য বাদলা পোকাদের আগমন এই ঘরে আর তারপর সব অন্ধকার।
ভাঙা চৌকির কাঁপা বন্ধ হলে সাবিনা চোখ খুলে দেখে আবার সে একা । কিছুক্ষন নিঃস্তব্ধ , তারপর পুলিশ ভ্যানের শব্দ । বৃষ্টি থেমে গেছে, বাইরে সোঁদা মাটির গন্ধ। পুলিশের জিপ ঢুকে পড়ল বিশাল লাল পাঁচিলের ভেতরে। জেলখানা গেটে তালা পড়তেই কেঁপে উঠল সাবিনা। সে দেখতে পেলো পুলিশের জিপ যেখানে দাঁড়াল , সেখানে ফনা তুলে দাড়িয়ে আছে এক সরীসৃপ আর তার চারপাশে শুধু বুটের শব্দ ।
আরও পড়ুন: ১৪ নম্বর গলি, রাজেশ চন্দ্র দেবনাথের ছোটগল্প

Check Also

রাজস্থানের ভৌতিক গ্রাম

রাজস্থানের রহস্যময় কিরারু গ্রাম

দেবশ্রী চক্রবর্তী: ভারতবর্ষের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত একখন্ড মরুপ্রান্তরের আনাচে কানাচে লুকিয়ে আছে রহস্য এবং রোমাঞ্চ। …