Breaking News
Home / রবিবারের আড্ডা / গল্প / রবিবারের গল্প ‘স্বপ্নে ওড়ে কল্পনা ‘

রবিবারের গল্প ‘স্বপ্নে ওড়ে কল্পনা ‘

ছোটগল্প

 

স্বপ্নে ওড়ে কল্পনা

শা ম্মী তু ল তু ল

চশমাটা কার?
কোন চশমাটার কথা বলছো?
বিছানার একপাশে পড়ে থাকা চশমাটা আগে খেয়াল করেনি কুহু;এতক্ষণে খেয়াল হয় তার। আমি কি করে বলব; কোন ছাত্র ফেলে গেছে হয়তো।
আমি যেদিন থাকিনা সেদিন কারা, কারা পড়তে আসে তোমার কাছে বলতো?
যা বলার স্পস্ট করে বলো মিহির। কারা পড়তে আসে তুমি ভালো করেই জানো ।
অনেক বড়ো একটা ফ্ল্যাট তাদের। দুইজনের বসবাস। কিন্তু মিহির নিয়মিত না। বড়ো গেস্ট রুম আছে। সেখানে বসেই কুহু ছাত্র-ছাত্রী পড়ায়। তাদের ঘিরেই কুহুর দিন যাপন।

গল্প
ছবি: প্রীতি দেব

 

অনেক্ষণ পর কুহু বলল, আবিদের হতে পারে চশমাটা।
আবিদ? আবার এসেছিল এই ছেলে? এখন তাহলে বিছানা পর্যন্ত গড়িয়েছে!
ছিঃ মিহির। দয়া করো আমাকে। পরীক্ষাটা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। সামনে ওর ফাইনাল পরীক্ষা। পক্ষ নেওয়াতে হাতে যা পেল তাই ব্যবহার করলো। সমস্যা নেই। কুহু অভ্যস্থ এতে।
মেয়েদের জীবন অভিনয়ে ভরা ; মান-সম্মান বজায় রাখার জন্য সমাজে তারা মিথ্যে অভিনয় করে বেড়ায়। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত গৃহিনীদের যতই গালে চড় থাপ্পড়ের দাগ থাকুক না কেন ভ্রু কুঁচকে হেসে বলতেই হয়, আর বলবেন না বাচ্চারা হাতে যা পাই তাই ছুড়ে মারে। কারণ আমারা মিসেস মিহির, মিসেস রহমান, মিসেস চৌধুরী-এসব নামে খ্যাত। এই নামগুলো অসম্মান করা যাবে না। স্ট্যাটাস নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ে রহিমন, করিমনেরা এসব তোয়াক্কা করে না। প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। ভালো মানুষের শয়তানরুপী মুখোশ খুলে দেয়।
বিন্দু বিন্দু ভালোবাসার সৃস্টি মিহিরের প্রতি। ক্লাসে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতো। আমি মাঝে মাঝে খেয়াল করতাম। সময় অসময়ে জলপাখি ডাকতো। ভালোই লাগতো। প্রথমবার ছিলো দুষ্টমী, দ্বিতীয়বার পছন্দের মালা গাঁথি। আর তৃতীয়বার ভালোবাসার দরজা খুলি।
আমাদের মধ্যে হাজার ঝড়-তুফান আসুক কেউ কাউকে ছাড়বো না কুহু। একে অপরকে ভুল বুঝবো না।ভালোবাসার চাইতে বন্ধুত্ব থাকবে বেশি। সব কিছু আমরা ভাগাভাগি করবো। আমাদের বন্ধুত্ব, ভালোবাসা হবে পৃথিবীতে সর্বশ্রেষ্ঠ। আমরা ইতিহাস গড়বো। হা হা হা। মিহিরের হাসিতে সেদিন বিশ্বাসে বুক বেঁধেছিলাম। বুঝতে পারিনি হাসিটা ছিলো নিছক মজা করা।
না বুঝে আমি’ই সব ভাগাভাগি করলাম। কত বোকা আমি।
গ্লাস ভাঙার শব্দ শুনে কুহু সম্বিত ফিরে পায়। ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে আসে।
আপা আমি খেয়াল করিনি।
সমস্যা নেই বুয়া। কাজ শেষ হলে চলে যেতে পারো।
জি আচ্ছা।
কিছু খাবে মিহির?
না খাবো না।
কিছু বলবে?
কি অবস্থা তোমার?
শরীর না মনের কথা বলছো?
ভালো করেই জানো কি জানতে চাচ্ছি।
চেষ্টা চলছে।
টেবিল চাপড়ে মিহির বলল, তোমাদের সবার চেষ্টা আর শুনতে ভালো লাগছে না।
কুহু বুঝল রত্নারও তাহলে একই অবস্থা। শরীরের ক্ষুদা মিটানো আর বীজ বপনের চেষ্টা। ভালোবাসার লক্ষণ নেই বারবার শুধু পৌরুষত্বের মহান কাজটি করে মিহির চলে যায়। এইকাজে তার গর্বের শেষ নেই। মিহির চলে যাওয়ার পর কুহু বারান্দায় বসে। বাইরে পূর্ণিমার আলো। চাঁদটাকে অনেক কাছে মনে হচ্ছে তার। পূর্ণিমার আলোয় কুহুর চোখে ভেসে উঠলো আবার সেই পুরনো জংধরা স্মৃতি…

শুনো, আজ রাতে ঘুমানো যাবেনা। সারারাত পূর্ণিমার আলো দেখে কাটিয়ে দিবো।
ধ্যাত, কি যে বলনা তুমি। আমি অসুস্থ। এতো রাতে খারাপ বাতাস গায়ে ভর করবে।
আরে তুমি আবার এসব বিশ্বাস করো কবে থেকে? হা হা হা। কিছু হবেনা। এসো। আমি এসব ভাবিনা। নতুন কেউ আসলে আসবে না আসলে নাই। তুমি হলেই আমার চলবে তোমাকে নিয়েই আমার জগৎ। তোমার শাড়ির আঁচলে আমার শান্তি। তোমার কোলে আমার স্বর্গ।
চিকচিক করছে কুহুর চোখ। চিরতার পানি খেতে খেতে দোলনায় দোল খায় আর ভাবে, সরকারী মেডিকেল কলেজ থেকে ভালো ফলাফল করলাম। চাকরিও হলো সেখানে। বিনামূল্যে রোগীর সেবা করবো। এই ভেবে সামনে এগোচ্ছিলাম। কিন্তু মিহিরে অফুরন্ত ভালোবাসার কথা রাখলাম। কত সতী-সাধ্ধী নারী, নিজের সখ ইচ্ছা অনিচ্ছা শুধু বিছানায় বিসর্জন দিলাম। তাতে কি! উল্টে দিন দিন সন্দেহের পাত্রী হয়েছি। অথছ নিজেকে আগলে রাখছি যত্নে। যতো চেষ্টা তার একটু ভালোবাসার জন্য। এই যে চিরতার পানি নাক টিপে পান করছি তারই জন্য। শুধু নিজেকে মিথ্যে শান্তনা দিচ্ছি। পেটে সন্তান ধরতে পারছি না। দোষটা কার সেটা খুব ভালো জানে সে। মানতে চাইনা। এই বাহানায় নারীদের ভক্ষণের সুযোগ হাত ছাড়া করে না সে। নিজের কথা কোনো দিন ভাবিনি। কিন্তু উচিত ছিল। উচিত ছিল একাকীত্ব দূর করতে হাল বের করা। জীবন যখন ভোরে গেছে দিনযাপনের গ্লানিতে, মন খুলে হাসতে ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু হাসতে চেষ্টা করছি, ভাবতে চাই ভালো আছি। চলতে তো হবে। বাকি পথটুকু পাড়ি দেওয়ার জন্য শক্তি দরকার। মাঝে মাঝে ভাবি গভীর কুয়োর মধ্যে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছি। অন্ধকার হলে ভয় পাই। সারারাত জেগে থাকি সকালের অপেক্ষায়। কখন সকাল হবে, কখন অন্ধকার দুর হবে কিন্তু লাভ নেই, অন্ধকার ঘুরে ফিরে আসবেই। অন্ধকার পাশে এসে জানান দেয় এটাই তোমার ঠিকানা। প্রতিদিন এমন করেই আমার দিন রাত কাটে। ভাগ্যিস পড়ানোর অনুমতি ছিল বলে। নয়তো নিজেকে চিড়িয়াখানার জন্তু মনে হতো। এসব ভেবে ভেবে রাত শেষ হয় প্রতিদিন আমার। সকালবেলা দরজা খোলাই ছিল। মাত্র গোসল সেরে ড্রয়িং রুমে বসলাম। দরজায় চোখ পড়তেই দেখলাম, আবিদ দাঁড়িয়ে।
ম্যাডাম আসবো?
আবিদকে দেখতেই তড়িঘড়ি করে তোয়ালে দিয়ে বুক ঢাকলাম।
এসো আবিদ। বসো। আমার কিছু অঙ্ক মিলাতে পারছি না। তাই সকাল সকাল আপনাকে বিরক্ত করলাম।
পড়ন্ত অবস্থায় হঠাৎ আবিদ বলে উঠলো, এতো সুন্দর কেন আপনি? কেন এতো কিছু সহ্য করেন? আপনি চাইলে তো…
আমার বড়ো বড়ো চোখ দেখে আবিদের কথা মাঝখানে থেমে যায়। জানতাম ওর দূর্বলতা। ওর চোখ দুটো অনেক আদরের, চশমার ভিতরেও ওর চোখের ভাষা আমি বুঝতে পারি।
বললাম, ওসব তুমি বুঝবেনা। পরিস্থিতি অনেক কিছু বাধ্য করে মানুষকে। জীবনের অনেক চাওয়া পাওয়া সব সময় পূরণ হবে এমন কথা নেই। ঝড় আসবে বলে ঘর থেকে পালাতে হবে? তাকে প্রতিরোধের চেষ্টা করতে হবে।
আমার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বলল,
ঝড়ে যদি সেই ঘর ভেঙে পড়ে ম্যাডাম, তখনও কি আপনি আত্মরক্ষা করবেন না?
ওর কথা শুনে আমি আর কিছুই বলতে পারলাম না। ফ্যালফ্যাল করে ওর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। একদম বোকা বনে গেলাম। আবিদ চলে যাওয়ার পর ওর কথাগুলো মাথায় কাজ করছিলো বারবার। বড়ো বড়ো বুলি দিয়ে মনকে বোঝানো অনেক সহজ। কিন্তু বাস্তব কঠিন। সত্যিতো ঠিকই বলেছে ও। কলিংবেলের শব্দ শুনে মাথার কাজ বন্ধ হয়ে গেলো কুহুর। দরজা খুলতেই মিহির। ঘরে ঢুকেই বলে, চলো ডাক্তারের কাছে।
বললাম, আজ থাক। শরীরটা চলছে না।
বুকে সাহস নিয়ে ভয়কে আজ কাছে ঘেঁসতে দিলাম না। এই প্রথমবার মিহিরকে না করলাম। শরীরের ওপর অত্যাচার আর না। যাইহোক, আজকে আমার এই সাহসের প্রশংসার দাবিদার আবিদ। প্রাণপণ চেষ্টায় নিজেকে সামলালাম। হাত নামক অস্ত্রটা ব্যবহার করে মিহির চলে যায়। মিহিরকে না বলতে আজ কুহুর সব কিছু ভালো লাগতে শুরু করলো।
পরদিন আবিদ পড়তে এলে কুহু তাকে দেখে মিষ্টি একটি হাঁসি দিলো।
আবিদ ম্যাডামকে হাসতে দেখে খুব অবাক হলো। এই প্রথম ম্যাডামকে হাঁসতে দেখলো সে।
কুহুর মন ভালো আছে তা বুঝতে পেরে আবিদ বলল, সারাদিন ঘরে বসে থাকেন। চলেন বাইরে ঘুরে আসি। যাবেন?
আবিদ আমাকে অনেকবার এ-প্রস্তাব দিয়েছিলো। আমিতো আবার সতী সাধ্বী। সুযোগ দিতাম না। এড়িয়ে যেতাম। কিন্তু আজ ভিতরটা জেগে উঠছে। জিদও কাজ করছে। ওর কথায় যেন আমি জেগে উঠছি নতুন করে। ওর চোখের দিকে তাকাতেই পারছি না। সেটা আবেগে নয় লজ্জায়। কারণ আমার গালে চড়ের দাগ।
যাবো।
সত্যি যাবেন?

আবিদের উচ্ছ্বসিত চোখ। মনে হলো হাজার বছর ধরে এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করছিল সে।
বাইরে একটা মিহি বাতাস বইছে। আবিদের মতামতেই আজ শাড়ি পরেছি। সময়টা আজ শুধু ওর। নতুন কিছু আবিস্কারের আসায় নেমে পড়লাম। বেজায় খুশি আমরা। মোটোর সাইকেলে চড়ে পুরো বিশ্বটাকে হাতের মুঠোয় নিলাম। কখনও পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরছি। কখণও পানিতে ভাসছি। দু’জনে ছুটছি আনন্দ আর ভয়ের মাঝখানে। মনের মাঝে উঁকি দেওয়া ভয় ছুঁড়ে ফেলতে চেষ্টা করলাম। নীরবে সাহস যোগালো আবিদ আমাকে। সময়কে ধরে রাখতে আপ্রান চেষ্টা। হায়, সময় তুমি থমকে দাঁড়াও আজকের দিন তুমি সঙ্গী হও। আর কখনও মিনতি করবো না তোমার কাছে। তুমি যা চাও তাই পাবে। আমি আবিদের কাঁধটা আরও শক্ত করে হাত দিয়ে চেপে ধরলাম। আবিদও আমাকে পরম ভালোবাসায় নিজেকে ছেড়ে দিলো। সারাদিন আমাকে আগলে রাখলো। জীবনের সব দিন শুধু সাদা-কালো নয়, রঙিনও হয়। আজ উপলব্ধি করলাম। সন্ধ্যা হয়ে এলো আনন্দের অবসান হলো।
আমি বিদায় নিয়ে উপরে উঠতেই আবিদ আমার হাত টেনে কাছে নিয়ে এলো। দুজন মুখোমুখি হলাম। আমি তার শরীরে মিশে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ বিদুৎ চমকানোতে হুঁশ ফিরলো। আমি সতী-সাধ্বী হয়ে গেলাম। মিহিরের মিথ্যে জলপাখি হয়ে আবিদকে দূরে ঠেলে দিলাম। জানি এখানেও আরও বেশি ধ্বংসের আভাস ভেসে আসছে…

আরও পড়ুন: রবিবারের গল্প “আমার নাম লাল”

Check Also

অমিতাভ দাসের ছোটগল্প

রবিবারের ছোটগল্প শূন্য থেকে শুরু লিখেছেন অমিতাভ দাস

ছোটগল্প শূন্য থেকে শুরু অমিতাভ দাস Illustration: Preety Deb একটা লোক সেই থেকে চিৎকার করেই …