Home / রবিবারের আড্ডা / গল্প / রবিবারের ছোটগল্প মাছি লিখেছেন দেবশ্রী চক্রবর্তী

রবিবারের ছোটগল্প মাছি লিখেছেন দেবশ্রী চক্রবর্তী

ছোটগল্প

মাছি

দে ব শ্রী চ ক্র ব র্তী

ছোটগল্প

ছবি: প্রীতি দেব


আয়নাটা যেন গোটা ঘরকে গ্রাস করছে । দেওয়ালে ঝুলন্ত বেলজিয়াম গ্লাসের আয়নায় ঢুকে গেছে গোটা ঘর । রকিং চেয়ারে বসে এক দৃষ্টে রবিশঙ্কর তাকিয় আছেন নিজের দোদুল্যমান প্রতিবিম্বের দিকে । আজ ইচ্ছে করেই ঘরের সবকটা জানালা খোলা রেখেছেন তিনি । দক্ষিণের জানালা দিয়ে ঝড়ো হাওয়া এসে দুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে ঝাড়বাতিটাকে , তার মতন ঝাড়বাতির ছায়াও দোল খাচ্ছে দেওয়ালে । ঝড়ো বাতাসের সাথে বৃষ্টির ফোটা ফোটা জল এসে পড়েছে আয়নার মধ্যে , দূর থেকে দেখে মনে হয় যেন থিক থিক করছে মাছি । রবিশঙ্কর চশমার কাচে লেগে থাকা সাদা দাগ গুলো ভালো করে মুছে একটু ঝুকে দেখলেন আয়নার দিকে । না চোখের ভুল না, সত্যি ঘরময় মাছি যা ধিরে ধিরে তার সারা শরীর ঢেকে দিচ্ছে । সে দু হাতে তাদের সরিয়ে দেওয়ার নিস্ফল চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে চেয়ে রইলেন আয়নার দিকে । দক্ষিনের খোলা জানালা দিয়ে ছুটে আসছে লাখ লাখ মাছিরা , তারা বাসা বাধছে রবিশঙ্করের চোখ, নাক, কান , মুখ সহ সারা শরীরে ।

ঘরের কোন থেকে পোষা হুলো বেড়ালটা ক্রমে ডেকেই চলেছে , স্তুপ স্তুপ মাছির ভেতর দিয়ে সেই শব্দ শুনে মনে হয় যেন সদ্যজাতের আকুতি ভেসে আসছে নদীর ওপার থেকে ।

তারপর যেন সব কিছু অন্ধকার হয়ে যায় , কালো চিত্রপটের মাঝে জেগে থাকে বৃষ্টি আর বজ্রপাত ঐ অন্ধকারে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যেন কারা এগিয়ে আসে । সারিবদ্ধ মানুষেরা লোটাকম্বল বেঁধে এগিয়ে আসে , কাদা মাটির ওপর ছিহ্নমূল গুলো গেঁথে যাচ্ছে আশ্রয়ের শেষ আকুতি নিয়ে । সাবিনাও ছিল সেই দলে । বৃষ্টি ভেজা মাটির ওপর ছপাত শব্দ আর গাছের ডাল পালা আর ঝোঁপের মাঝে লুকিয়ে থাকা সরীসৃপের দৃষ্টির থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে বোরখায় ঢুকে সে এগিয়ে চলেছে এক কোচি শামুকের মতন । শামুক খোলের মতন উঁচু হয়ে থাকা পেটটা মাঝে মধ্যেই নড়াচড়া করে উঠতেই অসময়ে বজ্রপাত হল সামনের জঙ্গলে । অন্ধকারে বজ্রের আলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তেই আগত পথিকরা দাঁড়িয়ে পড়লেন । দাউ দাউ করে জ্বলছে জীবন্ত গাছ গুলো , যার ডালপালা সব কিছু লাল লাভার মতন ঝরে পড়ছে ভেজা মাটির ওপর । সারা শরীরটা তিরতির করে কেঁপে উঠতেই নিজেকে জ্বলন্ত গাছের মতন মনে হল তার । গাছ বলতে মেকঙ্গ নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই হাতানাউঙ্গ গাছটি যার ডালে বাসা বাঁধা ছিল এক ফিঙ্গে পাখি।

রবিশঙ্কর অন্তরদৃষ্টিতে দেখতে পেলো , বেলজিয়াম কাচের আয়নায় হাতানাউঙ্গ গাছের ছায়া , তার দুটি ডালের মাঝখান দিয়ে ডুবন্ত রক্তিম সূর্যের মাঝে ফিঙ্গে পাখির ছায়া । ওপারের মনেস্ট্রি থেকে ভেসে আসছে সন্ধ্যার উপাসনার ধ্বনী । শেষ বেলার তেজ যে বড় ভয়ঙ্কর , সেই তেজ প্রত্যক্ষ ভাবে পড়ছে পাখীর বাসার ওপর । রবিশঙ্কর চোখের পাতা ভালো করে ডোলে একবার পরিস্কার করে দেখলেন জ্বলন্ত পাখীর বাসার থেকে মা আর সাবকের দেহ ঝড়ের হাওয়ায় এগিয়ে চলেছে, রোহিঙ্গাদের গ্রামের দিকে । জ্বলন্ত হাতানাউঙ্গ গাছ থেকে সেই আগুন দাবানলের মতন এক সন্ধ্যায় ছড়িয়ে পড়ল গোটা গ্রামে , ডুবন্ত সূর্যের রঙ আর দাবানলের রঙ মিলেমিশে রক্ত বন্যায় ভেসে চলা হাজার হাজার লাশ, যেন সদ্যজাত শিশুদের নগ্ন দেহ ।

রবিদের মতন মানুষেরা ধান ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে ছুটে গেছিল জঙ্গলের পথে, তারা অনুসরণ করেছিল রক্ত, পোড়া কাপড় আর গোঙ্গানীকে । সারা বিশ্বে ঘটে যাওয়া অমানবিকতার খবর খুঁজে আনাই তো তাদের কাজ । শিকারির মতন সে খুঁজে বেড়িয়েছে খবর । এ যেন ঘরের মধ্যে আরেকটি ঘরের চিত্র । তৃতীয় বিশ্বের ক্ষমতাবান শ্রেনীর প্রাচূর্যের আড়ালে বেড়ে ওঠা ক্ষমতাহীন আরেকটি শ্রেনী , খাদ্য আর খাদকের এক অসম সহাবস্তান ।

বৃষ্টি কিছুক্ষণ আগে থেমে গিয়েছে, মাছিরা সব অদৃশ্য হয়ে যেতেই রকিং চেয়ারে দোল খেতে খেতে তিনি দেখলেন আয়নায় ঝাড়বাতির আলোয় ভেসে উঠল জ্বলন্ত দুটি চোখ । যেন আশ্রয়হীন এক ফিঙ্গে পাখি তাকিয়ে আছে তার দিকে ।

জীবন্ত গাছপালা সব পুড়ে লাভার মতন ঝড়ে পড়ছে মাটির উপর, সাবিনার শরীরটা আজ আস্ত এক হাতানাউঙ্গ গাছ । পেটের ভেতরের জ্বলন্ত পাখিটা অসময়ে বেরিয়ে আসতে চায় । সে গুঙ্গিয়ে উঠতেই মাটিতে তার থাবা আরো দৃঢ় হয়ে বসল । মেয়ে মানুষের এই কোকানি যে বড় লজ্জার, বোরখাটা দু-হাতে চেপে ধরে বসে পড়ল মাটির ওপর । বৃষ্টি কিছুক্ষণ আগে থেমেছে, রাস্তার কাদার ওপর যেন এক উল্টোন ঘট । আগুনটাও যেন নিভু নিভু প্রায় । আকাশের মেঘের ফাঁক দিয়ে আলোর ছটা বেরিয়ে এলো , ঠিক যেন সোহাগ রাত । রবিশঙ্করের আয়নায় ভেসে উঠল এক নব-বধূর লাজুক মুখ , যে চেয়ে আছে আকাশের দিকে ।

চারিদিকে ফিসফাস শব্দ, সারা শরীরে সোদা মাটির গন্ধ নিয়ে জীবন্ত গাছের মতন ডালপালা মেলে শুয়ে আছে এক যন্ত্রণা-কাতর নারী । সে চেয়ে আছে আকাশের দিকে । মেঘের আড়াল থেকে আলো এসে পড়ছে তার কোটরের ওপর , যার থেকে বেরিয়ে আসছে এক জীবন্ত ফিঙ্গে পাখি । অন্ধকারের চাদর সরিয়ে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয় আয়নায় । কিশলয়ের গন্ধে জেগে উঠেছে ছিহ্নমূলেরা । ঝোঁপের আড়াল থেকে মোডেমের শব্দ ভেসে আসতেই ক্যামেরার আলো ঝলসে ওঠে সদ্যজাতের মুখে । তারপর প্রথম বিশ্বের সপ্তম প্রজম কম্পিউটারের পর্দায় ভেসে ওঠে তার ছবি , সারা মুখে মাছি । আওয়াজ ওঠে ফ্যান্টাস্টিক , এডিট করে আরো দু চারতে বসিয়ে দিলে জমে যাবে । সেই থেকে রবিশঙ্করেরা কপি পেস্ট করেই চলেছেন । কোন বিষয়ে বহুদিন গবেষণা করলে গবেষকের জীবনে তা ছেয়ে যায় । রবি তাই তার চারপাশে মাছিদের দেখে। মাছিদের সাথে-ই তার সহাবস্থান।

আরও পড়ুন: রবিবারের সান্ধ্য কবিতা আসর-১১

Check Also

উপন্যাস খাতা ২য় পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস খাতা লিখেছেন দেবশ্রী চক্রবর্তী : পর্ব-২

ধারাবাহিক উপন্যাস খাতা দেবশ্রী চক্রবর্তী Illustration: Preety Deb রাত পৌনে বারোটা নাগাদ তিতির চার্চের সামনে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *