Home / রবিবারের আড্ডা / সাহিত্য চর্চা / নাটক রিভিউ : এক মঞ্চ, অনেক জীবন লিখেছেন অর্পণ পাল

নাটক রিভিউ : এক মঞ্চ, অনেক জীবন লিখেছেন অর্পণ পাল

নাটক রিভিউ

এক মঞ্চ, অনেক জীবন

অর্পণ পাল


নাট্যাচার্য গিরিশ ঘোষের জন্মের একশো পঁচাত্তর বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে রাজ্য সরকারের ব্যবস্থাপনায় সদ্য তাঁরই নামাঙ্কিত বাগপবাজারস্থিত মঞ্চে তিন দিনের নাট্যপ্রদর্শনীর দ্বিতীয় দিনে মঞ্চস্থ হল গিরিশ ঘোষের জীবনের ওপরেই আধারিত নাটক— ‘এক মঞ্চ এক জীবন’। নাটকটির রচনাকার উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়, ‘পূর্ব পশ্চিম’ নাট্যদলের এই নাটকটি মঞ্চস্থ হয়ে চলেছে গত বছর-দুই ধরেই। এতদিনে আমি দেখে উঠতে পারিনি, এ আমার পরম ব্যর্থতা।
কেন ব্যর্থতা, সেটা বলি। প্রথমত, দেবশংকর নামক ব্যক্তিটির অভিনয় আর সংলাপ-উচ্চারণ সম্বন্ধে কেন কোনো বিশেষণই যথেষ্ট নয়, সেটা এই নাটক দেখার আগেও আমি জানতাম, এবারে সেটা আমার মননে এমনভাবে পোক্ত হয়ে বসল, বর্তমান জন্মে সে ধারণা বদলাবে না, এ ব্যাপারে আমি শিওর।
নাটক
তিনি কী করেননি! প্রতিটি দৃশ্যে তিনিই সব, বাকিরা সৌরমণ্ডলের গ্রহদের মতো তাঁকে ঘিরেই আবর্তিত। যেমন, নাটকের শুরুতেই দেখি— মঞ্চে গিরিশ ঘোষ উচ্চাসনে বসে আছেন, তাঁর মাথায় লাল আলো এসে পড়েছে, তাঁর সামনে দশ বারোজন দণ্ডায়মান। গিরিশ ঘোষ স্থির হয়ে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছেন, বোঝা গেল— তিনি আসলে নিজের প্রতিকৃতির প্রতিনিধিত্ব করছেন, বাকিরা তাঁর স্মৃতিচারণায় সমবেত হয়েছেন। এরপর একে একে উপস্থিত মানুষজন তাঁকে নিয়ে বলতে আরম্ভ করলেন, আর কখন যেন তাঁদের বক্তব্যের মধ্যেই উঁচু আসন থেকে তাঁদের মধ্যে নেমে এলেন গিরিশ ঘোষ, তাঁর জীবনের টুকরো কথা তিনি শুরু করলেন নিজেই, ফ্ল্যাশব্যাকে। দৃশ্যের মধ্যে থেকেই জন্মাতে লাগল আর একটি দৃশ্য। ‘ড্রামা উইদিন ড্রামা’।
তাঁর নিজেরই নির্মিত বিভিন্ন নাটকের ছোট ছোট দৃশ্য মঞ্চের ওপরে ঘটতে লাগল, আর আমাদের মন থেকে ক্রমশ হারিয়ে যেতে লাগল এই অনুভূতি— আমরা দেবশংকরের অভিনয় দেখছি না, আমাদের সামনে গিরিশ ঘোষই নিজের চরিত্রে অভিনয় করে যাচ্ছেন। আড়াই ঘণ্টার গিরিশদর্শন, সত্যিই। তাঁর দল বদলানো, নতুন নতুন চরিত্রের আগমন, নটী বিনোদিনীর সঙ্গে কাজের সূত্রপাত, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সম্বন্ধে গিরিশের বিরক্তিপ্রয়াস, এবং তৎপরবর্তী রামকৃষ্ণের ভাবশিষ্য হিসেবে তাঁর নবজন্ম লাভ— সব যেন চোখের সামনে দৃশ্যের পর দৃশ্যে ঘটতে দেখলাম। আর রামকৃষ্ণের কথা কী বলব। তাঁর (দীপেন ভট্টাচার্য) অসাধারণ রূপধারণ, বাচনভঙ্গিমা, অঙ্গ সঞ্চালনা— সমস্তই নিখুঁত, এক ঐশ্বরীয় বিভায় আলোকিত।
বেশ কিছু দৃশ্য এখনও চোখের সামনে দেখছি যেন, ঘোরে থাকার উদাহরণ হিসেবে যেটাকে স্থাপনা করতেই পারি। একটি দৃশ্যে গিরিশ ঘোষের থিয়েটার দেখতে এসেছেন রামকৃষ্ণ, তাঁকে প্রণাম করতে যাচ্ছেন গিরিশ। তাঁর সামনে গিরিশ যখন সামান্য ঝুঁকে নমস্কার বললেন, রামকৃষ্ণ বললেন, নমস্কার। গিরিশ আবার একটু ঝুঁকে নমস্কার বললে রামকৃষ্ণ আর একটু ঝুঁকে, একই ভঙ্গিতে বললেন, নমস্কার। গিরিশ রামকৃষ্ণের সামনে শুয়ে পড়লেন, রামকৃষ্ণও একই অবস্থানে এলেন। মুখোমুখি হওয়ার পর গিরিশের চোখে এক অপার্থিব আলো জ্বলে উঠল, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ঠাকুর, সত্যি করে বলো তো, কে তুমি?

আরও দেখুন: Pacific Rim Uprising হলিউড সিনেমায় রোবটের ভয়ানক কর্মকান্ড

সেই আকুতি, সেই নিদারুণ আর্তিমাখা নিবেদন এক মুহূর্তে ভুলিয়ে দিল কে গিরিশ কে রামকৃষ্ণ আর কে-ই বা আমি। চোখের সামনে এক অলীক দৃশ্য চিরকালের মতো স্থির হয়ে রইল, হয়েই রইল। আলো আর ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিকও এই কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ সৃষ্টিতে যথেষ্ট সহায়তা করেছে।
দেবশংকর ইদানীং বেশ কিছু ঐতিহাসিক চরিত্রে নিয়মিত রূপদান করছেন— দেবব্রত বিশ্বাস, স্বামী বিবেকানন্দ, ঋষি অরবিন্দ, চার অধ্যায়-এর অতীন (ঠিক ঐতিহাসিক চরিত্র না হলেও পিরিয়ড- ড্রামাটিক তো বটে)— ইত্যাদির নাম আপাতত মনে পড়ছে।
যাই হোক, রামকৃষ্ণের পাশাপাশি নটী বিনোদিনী তাঁর কণ্ঠনৈপুণ্যে মুগ্ধ করেছেন, তাঁর বেশ কিছু দৃশ্যে অভিনয়ও অসাধারণ। গিরিশ ঘোষের স্ত্রীয়ের ভূমিকাভিনেত্রীর অভিনয় চোখে পড়ার মতোই সাধারণ, পাড়ার নাটকে পেশাদার মহিলারা যে ধরনের অভিনয় করে থাকেন, সেরকমই করেছেন তিনি।
অর্ধেন্দুশেখর মুস্তোফির চরিত্রে খুবই স্বাভাবিক অভিনয় করেছেন নাট্যদলের মুখ্য ব্যক্তিত্ব সৌমিত্র মিত্র। আর বাকিরা ঠিকঠাক, তাঁদের বিশেষ কিছু করতে হয় নি, একা দেবশংকর তাঁদের ম্লান করে দিয়েছেন।
তবে, শেষে এসে এটা না বলেও পারছি না, দেবশংকর অসাধারণ একজন অভিনেতা, কিন্তু তাঁর অভিনয়ে খুব সামান্য একঘেয়েমি এসে যাচ্ছে বলে মনে হল এই নাটকটি দেখে। তাঁর বিশেষ ম্যানারিজম, ‘ফিজিক্যাল অ্যাক্টিং’ (ষ্টেজময় দাপিয়ে বেড়িয়ে যেভাবে তিনি কিঞ্চিৎ উচ্চকিত সংলাপ একটানা বলে যেতে পারেন হাত পায়ের সঞ্চালনায়— সেটাকেই আমি ‘ফিজিক্যাল অ্যাক্টিং’ বলছি, অন্য কোনো পরিশব্দ জানা নেই)— যেটা তাঁর মুখ্য বিশেষত্ব— সেখানে অন্তত আমার চোখে অন্য নাটকগুলিরকিছু নাট্যদৃশ্যের খুব হাল্কা মিল পেলাম যেন। জানি না এটা আমার অনভিজ্ঞতাপ্রসূত ধারণা কি না।
তবে, কুড়ি পঁচিশটা নাটকে একটানা দিনের পর দিন ঘুরিয়েফিরিয়ে অভিনয় করে যাওয়া, আবারমুখ্য চরিত্রে— কী পরিমাণ ক্ষমতা, অধ্যবসায় আর পরিশ্রম তাঁকে আজ এই জায়গায় এনেছে, সেটা ভাবলে তাঁর প্রতি আর কোনো অভিযোগ করতে মন সায় দেয় না। শুধু এইটুকুই বলার— যতই একঘেয়েমির ছোঁয়া দেখা দিক, দেবশংকর হালদার বাংলা নাটকের মুকুটবিহীন সম্রাট, আগামী আরও অনেক বছরের জন্য।
‘এক মঞ্চ এক জীবন’ যেমন গিরিশ ঘোষের জীবননাট্যের সুপ্রযুক্ত শিরোনাম (নামকরণ-সৌজন্যে কবি শ্রীজাত), একইরকম একটি শিরোনাম দেবশংকর হালদারেরও প্রাপ্য— এই লেখার শিরোনামেই সেই উদযাপন। সকলকে একটাই অনুরোধ— এই নাটক সকলে দেখুন, সকলে অনুভব করুন।
আরও দেখুন: ঘরে এ্যান্ড বাইরে সিনেমার এই গানটি সবার মন ছুঁয়ে গেল

Check Also

একুশে কবিতা পত্রিকার আড্ডা

বহরমপুর শহরে একুশে কবিতা পত্রিকার আড্ডা

ঝুমঝুম সাহা, বহরমপুর: সাল ২০১০। একদল তরুণ ভাবলেন অন্যকিছু করবেন। কিন্তু কি অন্যরকম? রাস্তায় দাঁড়িয়ে-ই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *