Breaking News
Home / রবিবারের আড্ডা / গল্প / রবিবারের ছোটগল্প রাজার ফাঁদ লিখেছেন সসীম কুমার বাড়ৈ

রবিবারের ছোটগল্প রাজার ফাঁদ লিখেছেন সসীম কুমার বাড়ৈ

ছোটগল্প

রাজার ফাঁদ

স সী ম কু মা র বা ড়ৈ

ছোটগল্প

Illustration: Preety Deb


পৈসাঞ্জুকে হিড়হিড় করে ঘর থেকে ক্যাম্পের মাঠে টেনে এনে চৈতা বর্মন বলল-তামান মানসির সামনি কন, তোমার বাপ কোথায় গেইছে। পৈসাঞ্জু থতমত খেয়ে লড়াকু যুব নেতার মুখের দিকে সন্ত্রস্ত চোখে তাকাল। সে ধমক দিয়ে বলল-চুপ মাইরা আছেন ক্যান, হাচা কতা কন শিগ্‌গির। পৈসাঞ্জু হাঁসের মতো ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল-মো-র বাপ দিইল্লি গেইছে বেড়াইতে। রিপোর্টারা হামলে হামলে পড়ে সোসাল মিডিয়ার একটি ক্লিপ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল-এই যে আপনি ক্যামেরার বলেছেন, আপনার বাবা খামারু রায় ক্যাম্প ছেড়ে বাংলাদেশ চলে গিয়েছে মনে হয়।
-আ..আজ্ঞে, ও..ও.ওইডা মুই কই নাই . . পৈসাঞ্জু্র গলা থেকে খড়খড় করে ঝরে পড়ল শব্দগুলো।
পৈসাঞ্জুর মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই চৈতা তার ডানা ধরে ঘরের দিকে হাঁটা লাগাল। পিছনে ধাবমান রিপোর্টদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে সে বলল-তম্‌রা এবার আসেন, কোথার কুন চ্যাংড়া ছেবেলা মোবাইলে অ্যাকখান ছবি দিল আর তম্‌রা ঝাঁপাই মরছেন। তারপর সে পৈসাঞ্জুকে চাপা ক্রুদ্ধস্বরে বলল-বিদ্যাশ থাকি উড়ে আইসা জুড়ে বসিছ। আবার ঝামেলা পাকাইছ। মিডিয়া যাউক, তমার পুটকির মধ্যি ডাং ঢুকাই দি্মু, হালা বাঙাল ছিটমাল।
পৈসাঞ্জু মিনমিনে গলার বলার চেষ্টা করল-মোর বাপের এই ক্যাম্পের ছোট্ট টিনের ঘরত্‌ থাকতি শ্বাস বন্ধ হইয়া জায়। গরমে ফোঁস্কা পড়ি যাইবার নাহান অবস্থা।
চৈতা ভেঞ্চি কেটে উঠল-উয়ু, পাচাত নাই ত্যানা, ভাসুরে বাজাযই ব্যানা।
সাংবাদিকরাও নাছোরবান্দা। পৈসাঞ্জুর বাইট না নিয়ে নড়বে না। চৈতা দলবল নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল খামারুর ক্যাম্পঘরের দরজায়। উদ্বাস্তুরা কেউ এমুখো হওয়ার সাহস দেখাল না। মুখে কুলুপ এঁটে সবাই এড়িয়ে গেল সাংবাদিকদের। ভিতর থেকে ঘরে খিল এঁটে খামারুর পরিবার অন্ধকারে মুখ গুঁজে বসে আছে। দমবন্ধ গিরগিটির মতো পাংশুটে সাতসাতটি মানুষ, মুখে সকাল থেকে এক রত্তি দানা-পানি পড়েনি। সরকারি লঙ্গরখানার কোলাহল একটু করে কমে আসছে। খেয়েদেয়ে বাসিন্দারা একে একে ক্যাম্পে ফিরে যাচ্ছে। কোচবিহার-আদাবাড়ি ঘাটের শেষ বাসটি চলে গেল দিনহাটা গোসানিমারি রোড ধরে। বাসের খোলে আধঘুমে গুটিকয় ছিবড়ে মানুষ, তারা চলে যেতেই পৃথিবী এখানে থমকে গেল। রাতের নিস্তব্ধতা গোগ্রাসে গিলে নিল পেতলা কৃষিমেলা ক্যাম্প, বাংলাদেশ থেকে আসা ছিটমহলের উগড়ানো উদ্বাস্তু মানুষজনকে। গোটা ক্যাম্প ঘুমিয়ে পড়েছে, ঘুম নেই খামারুর ঘরে। মানুষগুলো যেন অস্তিত্ব শূন্য মুক বধির। নিরুদ্দেশ বৃদ্ধ মানুষটির জন্য গলা ছেড়ে কাঁদা যাবে না, নিখোঁজ ডাইরি করতেও থানার চৌহাদ্দি মাড়ানো যাবে না। ক্যাম্পের আশ্রয়টুকু বাজি রাখার মতো ক্ষমতা তাদের নেই। বাতাসের আগে সব খবর পৌঁছে যাবে চৈতাদের কাছে। চৈতা-জিল্লুর’রা কি সব প্রশাসনের হাওয়াকলের বাতাস? চৈতাকে দেখলে পৈসাঞ্জুর বুকের মধ্যে ঘা দিয়ে যায় ওপারের জিল্লুর খাঁ। হিম হয়ে যায় ভাবনা চিন্তা। তাদের ছিটমহল দাসিয়ার ছড়রা ছিল জিল্লুরের মুক্তাঞ্চল, সে নিজের এলাকায় শের আর ছিটে চেঙ্গিস খান। জিল্লুর-চৈতা শাসক দলের লোক, রাষ্ট্রেরই তো সৈনিক। অন্ধকার কাঁপিয়ে পৈসাঞ্জু’র একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। দীর্ঘশ্বাসের শব্দে তার মা ফুঁপিয়ে উঠল-ও পৈঞ্জা, বাপরে খুঁইজা নিয়া আয়। মানসিটে আস্তাঘাট কিছু চিনে নাই। পঁই পঁই করয়্যা কইসিনু, আমাগো রাইখা তমরা ইণ্ডিয়া জাও, শুনলি নারে বাপ। বুড়া মানসিডার কী হইলরে!
-বাবা, সামনে ওডা কি?
-সিঙ্গিমারি নদী, উজানে কয় জলঢাকা-ফুলেশ্বরী আর আমাগো ভাটিয়ায় ধরলা।
-এ্যতো নিশুত রাইতে মোরা নদীর কাছে আইলাম ক্যান?
-তোর দাদু এই নদীর কাছত্‌ আসতে খুউব পছন্দ করত।
সদ্য গোপ গজানো ষোল সতেরোর কিশোর পৌষাল সে অবাক, দাদু এতটা পথ পারাইয়া আসতো নদীর কাছে! কৃষ্ণ পক্ষের জ্যোৎস্না আলোয় কম করে তারা তের চৌদ্দ কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে এসেছে। দিনহাটা-গোসানিমারি রাস্তার উপর মাশানদেবের মন্দিরের বন্ধ দরজায় পৈসাঞ্জু মাথা ঠুকে সারাদিনের জমানো কান্না উগড়ে দিয়েছে। দেখে পৌষালের বুকের মধ্যে হুঁ হুঁ করে উঠেছিল। দাদু মানুষটা কেমন বাঁও বাতাসের মতন উবে গেল। দাদু কোমরে খাটো ধুতি আর কাঁধে একখান গামছা ফেলে হাওয়ার মতো ঘুরে বেড়াত। বাতাসে উড়ত গামছার খোঁট। পায়ে পায়ে ঘুরত ছোট্ট পৌষাল। কোথাও হাঁটাই দিলে জিজ্ঞেস করত-ও দাদু, জাইস্‌ কই।
-বাংলাদ্যাশে।
-দাদুভাই, মোরা তো বাংলাদেশেই আছি।
-না-রে ভাই, না।
দাদু কাঁধের গামছাখান দড়ির মতো পাকিয়ে মাথার উপর দিয়ে চক্রাকারে ঘুরিয়ে বলত-হামেরা দসিয়ার ছড়রা গারামে থাকি। এ্যই চল্লিশ ঘর বাদ দিয়া চাইর দিকত্‌ বাংলাদ্যাশ। ওই যে কনকগো বাড়ি দ্যাখো ওডা জয় বাংলা।
-হামেরা তালি কোন দেশের মানসি?
-হামেরা নাকি ইণ্ডিয়ার লক।
পৌষাল খিল্‌খিল্‌ করে হেসে উঠত-ধ্যুত, একটা দেশের প্যাটের মধ্যি আর এ্যাকটা দেশ হয় কি করয়্যা? ইণ্ডিয়া নাকি কত্ত বড় দেশ। কু ঝিক্‌ঝিক্‌, কু ঝিক. . . টেরেনে এমাথা থাকি ওমাথা যাতি তিন চাইর দিন লাইগ্যা জায়।
-তামান কবুতরে খাইছে। রাজার কবুতর ডানায় উড়াইয়া আনছিল আমাগো লাইগ্যা দুঃখু। কোচবিহারের রাজার কী দাপট, কবুতরের পাখনায় জয় করল দসিয়ার ছড়রা, ভূতবাড়ি, কুচলিবাড়ি, সিঙ্গিমারি, পানিশালা, বাঁশকাটার মতো একশো এ্যাগারোটে গারাম। আর অংপুরের রাজা তো ল্যাজে গোবরে, মারি-কাটি এ্যাকাইন্নডা নিয়াই খালাশ। এ্যাক এ্যাকবার দামামা বাজে আর জয়ী কবুতর উড়য়্যা আসে। মোর দাদা-ঠুহুর্দাও জানত নাই, কবে থাকি মোরা উলখাগড়ার মতো পুইড়্যা আছি। যে কিস্তিমাত হইত অমনি হেই রাইজ্যের পেটের মধ্যে উড়য়্যা আইত জয়ী রাজার পোষা কবুতর। হাউগ্যার রাজারা বুঝল না, উমুরায় দাবার চালে না পাশার চালে চিরকাইলের জইন্নি নাকাবন্দি হইয়া গেইসি দুই পারের কতোগুলা মানসি। মোর এস.এল.আর-ডা থাকলি সব কবুতর ইয়াহিয়ার পাক কুত্তাগুলার মতো ঝাঁঝরা করি দিতাম।
দাদুর কবুতরের উপর বেজায় রাগ। বুড়ো বয়সেও বাচ্চাদের মতো গুলতি দিয়ে কবুতর মারতে তেড়ে যায়। রাগে শরীর টানটান হয়ে যায়। পৌষাল একটু বড় হয়ে বুঝেছিল আসলে একজন মুক্তিযোদ্ধার রাগ অন্যায়ের বিরুদ্ধে। ৭১’রের যুদ্ধে জান বাজি রেখে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল পাকিস্থানী হানাদার তাড়াতে। এই প্রশ্নটাই পৌষালের মাথা গুলিয়ে যেত, সে জিজ্ঞেস করত- ও দাদু, মোরা ইণ্ডিয়ার লোক হলি তুই যুদ্ধ করতে ক্যান গেইসিৎ?
খামারু রায় নাতির কচি মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবত। তারপর দাদু নাতি হাঁটতে হাঁটতে পুকুর পাড়ে গিয়ে ঘাটে বসত। ছায়াঘন কালো জলের দিকে মুখ রেখে পৌষালের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে কামারু বলত-তুই এখন বুঝবি নাই, তউ কই। হামেরা এই দ্যাশের জল, বাতাস খাই। লুকাইয়া লুকাইয়া জাই হাটে বাজারত্‌ সওদা করতে। তোরে পাশের গারামে প্রাইমারি ইস্‌কুলত ভর্তি করাইছি নাম ঠিকানা পাল্টাইয়া। বাংলাদ্যাশে পাতানো বাপের নাম দিয়া। বড় হয়ি বুঝবি হামেরা এ্যক নাই রাইজ্যের মানসি। কত যে কষ্ট জেবনে। তউ ছিটের মানসি এই দ্যাশেরই দয়ায় বাঁচে, ঘিন্নায় বাঁচে। আমাগো ইণ্ডিয়া ঢোকার আস্তা নাই। বাঁচা মরাই যখন উমুরা ঠিক করি দ্যায় তখন কি করয়্যা কই এই দ্যাশ আমাগো নয়? যুদ্ধ লাগল তকন এ্যাকটাই দ্যাশ। পাক সেনা, আল-বদর আর রাজাকারের বন্দুকের ডগায় আমাগো জেবন। ভুলি গেনু মুই এই দ্যাশের লক নই। ইণ্ডিয়াও তো তখন হামেরায় মিতা দ্যাশ। ইন্দিরা গান্ধী সাক্ষাইত ঝ্যেন দুর্গা। কী ত্যাজ, রণংদেহী মূর্তি! ঝাঁপাই পড়লাম যুদ্ধে, এস.এল. আরের ট্রিগারে আঙ্গুল দিয়া শুদা ভাবতাম কবে পাকিদের নিকেশ করি দিব, কবে দ্যাশ স্বাধীন হবি। তর সইত না।
-দ্যাশ কি স্বাধীন করতে পারল্যা? খামারু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল বউ দেবারি পিছনে দাঁড়িয়ে দাদু নাতির কথা শুনছে। সে উত্তর খুঁজে না পেয়ে নাতির মাথা টেনে নিল বুকে।
-জন্মাইলা পরাধীন ইন্ডিয়াত্‌। ইংরাজ গেইল, দ্যাশ ভাগ হইল, পাকিস্থানের প্যাটে বন্দি হইল্যা। জল্লাদগুলারে তাড়াইয়া এখন বাংলাদ্যাশের ঘেড়ে বন্দি। তোমারে মুক্তিযোদ্ধা বলিও কেউ পোছে না। তোমারে যোদ্ধা ভাতা দেয়? তোমার নাম আছে মুক্তিযোদ্ধা লিস্টিতে? শুদা শুদা কচি পোলাডার বুকে দুঃখু ডুকাও ক্যান। ও কি এসব কতা বোঝে?
-কী করমু দেবারি, মুই জানি নাতিটে তামান কতা বোঝে না। কতা কইলে বুকের পাষাণডা এ্যাকটু হালকা হয়। শুনছি বডারে থাকা মানসের জেবন কপ্পুরের মতন। এ্যই আছে, এ্যই নাই। আর মোরা হনু ফাঁন্দিয়া রাজার পাতা ফাঁন্দে পড়া মানসি. . . ফাঁন্দে পড়িয়া বগা কাঁন্দেরে. . .
দাদুর যন্ত্রণা ভরা ভাওয়াইয়া গাছের পাতা স্থির হয়ে শুনত। পুকুরের জল ভিজে আরো ভারী হত। কিন্তু পৌষালের কানে পৌঁছাত না সেসব। সে বুঁদ হয়ে যেত দাদুর শৌর্যে। সে দাদুর কাঁধে হেলান দিয়ে ভাবত, দাদু র্যা ম্বোর চেয়েও কত্ত বড় শক্তি্মান! পৌষাল কনকদের বাড়ি টিভিতে সিনেমাটা দেখেছিল। কনকদের বাড়ি যেতে তার ভাল লাগে। কনকে তার পাখাওয়ালা পরি পরি লাগে। ওর সাথে উড়তে ইচ্ছা হয় কিন্তু সব কিছুতেই তার পায়ে যে বেড়ি। রাস্তাঘাট আলো বাতাস ওদের বাড়ি এসেই থমকে দাঁড়িয়েছে। তাদের বাড়ি প্যাঁচপ্যাঁচে কাদা আর অন্ধকারে ডোবা দ্বীপ। তবু দাদুর কথা ভেবে গর্বে চাপা পড়ে যেত যাবতীয় অন্ধকার। সে মুক্তযোদ্ধার নাতি! রক্ত ঊষ্ণ হয়ে ওঠতো। তুলতুলে কবুতর পাখিটা চলে যেত অপচ্ছন্দের তালিকায়। সে দাদুকে বলত- দাদু, তুমি একটে বকা মানসি। আস্ত্রটা ক্যানে জমা দিলা।
দু’তিনটা ঘুমন্ত বাস দাঁড়িয়ে আছে নদীর টাকিমারি-আদাবাড়ি ঘাটে। বাসস্ট্যাণ্ডটা জনমানব শূন্য। ভূতুরে। নদীচর থেকে ঠিকরে আসা জ্যোৎস্না আলোয় বাস ঘুমটি, দোকানপাট স্থির নিশ্চল। গোটা চর যেন কুহক মায়ায় আচ্ছন্ন। বাপ বেটা চরের পথ ধরে নদীর মূল ধারার দিকে এগোল। পথটা বেশ চওড়া, বালির উপর ছোট গাড়ি চলাচলে চাকার রেক হয়ে রয়েছে। দু’পাশে বিস্তির্ণ তরমুজ ক্ষেত। তরমুজ উঠতে আর বেশি দেরি নেই। চরে বেশ হাওয়া। শীত শীত ভাব। তাদের হাঁটার ক্লান্তি মুছে দিচ্ছে দক্ষিণা বাতাস। তরমুজ ক্ষেতে এদিক সেদিকে বেশ কিছু টোঙ। টোঙে নিভু নিভু হ্যারিকেনের আলো জোনাকি পোকার মত জ্বলছে। একজন জাগাই এত রাতেও ভাওইয়ার সুর ভাসাচ্ছে চরের জল-বাতাসে। দোতারার টুং টুং শব্দ তরমুজ পাতায় জমা শিশির মাখতে মাখতে ভেসে যাচ্ছে ভাটিতে-ওকি গাড়িয়াল ভাই, কত রবো আমি পন্থের দিকে চাইয়ারে… পৌষালের মন কেমন করে উঠল। দাদু বুড়ো বয়সেও সারিন্দা বাজিয়ে ফোকলা দাঁতে চমৎকার ভাওয়াইয়া গাইত! দেশ ছাড়ার সময় সঙ্গে এনেছে তার প্রিয় সারিন্দাটা আর ক্ষেতের একমুঠো মাটি। ইন্ডিয়া সরকার ছাপ্পর খুলে আশ্বাস দিয়েছে, বিনিময় মানুষজন নির্ভয়ে আসতে পারে। তাদের ঘর-বাড়ি, চাষের জমি দেওয়া হবে। দাদু জমি পেলেই তার উপর বিছিয়ে দেবে মাটিটুকু। কিছু দিন ধরে পৌষাল বুঝতে পারছিল, দাদুর মনে একটু একটু করে হতাশা জমছে। সারিন্দার তারে জমছে ধুলো। পৌষালের ভিতরে চোরা স্রোতের মতো একটা দীর্ঘশ্বাস বয়ে গেল। সে বাবাকে বলল- দাদু ফিরলে মুই এ্যাকদিন দাদুর লগে আবার এখানে আসমু। এই জাগাডা খুউব সোন্দর। নদীর পাশে বইয়া দাদু আর মুই গান গাইম। কতো কাইল যে সারিন্দায় হাত দেয় নাই দাদু।
পৈসাঞ্জু ছেলের কথায় উত্তর দিল না। চরের কোথাও বাবার চিহ্নমাত্র নেই। তাদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, অশক্ত শরীরে কোথায় যেতে পারে মানুষটি?
তারা একেবারে জলের কিনারে চলে গেল। সিঙ্গিমারি এখানে প্রায় দুই কিলোমিটার চওড়। চৈত্রে স্রোত হাড়গিলে চেহারা নিয়েছে, দুই তিনশো মিটারও নেই। বর্ষার আগেই পাহাড় থেকে সবার অলক্ষে নেমে আসে সাপের মতো জলের হিস্‌হিসে ফনা। খরোস্রোত নদীর তখন কুল কিনারা চেনা দায়। ওপাড়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি মাড়, আর একটি গোটা। দু’টি বড় দেশি নৌকা পাশাপাশি বাঁধা, তার উপরে পাটাতন জুড়ে তৈরি হয়েছে মাড়। শুখা মরসুমটুকু ছোট গাড়ি, তামাকপাতা ভর্তি রিক্সাভ্যান পারাপার করে মাড়ে। আর যাত্রী পারের তরী গোটা। সেদিকে আঙ্গুল তুলে পৈসাঞ্জু বলল-অঁয় পাড়টা আদাবাড়ি ঘাট। সিতাই ব্লক। জাগাডা প্রায় দ্বীপের মতন বিচ্ছিন্ন। আড়াই দিকে বাংলাদ্যাশ, এ্যাক দিকে নদী। নৌকাই তামান মানসির পারাপারের জেবন।
-বাবা, তুমি এ্যাতো সব চিনলা কি করি?
-তোর দাদুর জইন্নিরে।
-কও কী!
-দ্যাখস নাই, তোর ক্যামন দাদু খাঁচার পখির মতো ছটফট করইত। পোলাপানগো মতো শুদু বায়না ধরত, মোরে এখানে নিয়া জাইস্‌, ওখানে নিয়া জাইস্‌।
-তা এখানে আইল্যা কি করি?
-বড় শোলমারি পঞ্চাইত্‌ বাখরিগাছ নামে বাংলাদেশি এ্যাকটা ছিট ছিল। সিখানে ময়না খুড়ার বাড়ি। হা্মেরা লতায় পাতায় আত্মীয়। এ্যকদিন বাবা বায়না ধরল্য, ময়নার বাড়ি নিয়া ল্‌। নিয়া গেনু, ভাবলাম বাবার মন ভাল হয়ি জাবে। হইল গিয়া ওল্টি ঘটনা।
-ক্যান, ক্যান কি হইছিল বাবা? পৌষালের উদ্বিগ্ন গলা।
-ময়না খুড়ার বাড়ি যায়া মনে হইল বাবা খুব খুশি হইছে। ঘুইয়্যা ঘুরয়্যা উয়ায় জমি জিরাত দেখল। তামান গারামটে হামেরায় গারাম থাকি আলাদা কিছু নাই। আস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, ইসকুল কিচ্চু নাই। এখনও কিছু হয় নাই। হামেরা ফোকতোই আর বোরলি মাছের ঝোল দিয়া ময়না খুড়ার ঘরে খাইনু। ওফ্; কচু পাতার সঙ্গি লবন, কাঁচামরিচ, আদা, রসুন, আতপ চাউলের গুঁড়া, কোলমুড়ার ধুলার ছ্যাকা দিয়া খুড়ি যা ফোকতোই বানাইছিল না। কতোদিন ফোকতোই খাই নাই। বোরলি মাছের ঝোলটাও টাগড়ায় লাইগ্যা আছে। ক্যাম্পের আন্না ওই রোজ এ্যক ঘ্যাট, ট্যালট্যালে ডাইল আর বিলাশপুরি রুই মাছের ঝোল খাইতে খাইতে মুখি চর পরয়্যা গেইছে। বাবাও ফোকতোই চাইয়া খাইল। খায়েদায়ে ময়না খুড়া আর বাবা দাওয়ায় বসে হুঁকায় তাংকু টানছিল। এ্যখানে লক এখনো হুকায় তাংকু খায়। অঁয় ঝ্যে সিতাই ব্লক, ওখানে নাকি পশ্চিম বাংলার সব চাইতে বেশি তাংকু চাষ।
-জানি বাবা, সারাদিন আমাগো ক্যাম্পের সামনি দিয়া ভ্যানে করয়্যা দিনহাটায় তাংকু যায়।
-হ, ঠিক কইসু। অখানেই তো মহাজনগো শগল গুগাম।
-তারপর তমরা কি করল্যা? পোষাল জিঞ্জেস করল।
-দুই জনে দাওয়ায় বসি গপ্পোসপ্প করছিল। খুড়া কইল-‘জানো দাদা আস্তাঘাট আগেও ছিল নাই, এ্যাখনও ত্যামন হয় নাই। জমির দলিল পত্তর কবে হবি কেডা জানে। তবে আগের মতন আর ভয়, তরাস নাই। আগে ক্যাবলই মনে হইত এই বুঝি ইন্ডিয়ার পুলিশ ধরে। একবার ভরা পোয়াতি বউরে নিয়া গেইসিনু কোচবিহার সদর হাসপাতালত্‌। পোয়াতি বউডারে অপারেশনে নেবে সিজার করান লাইগ্যা এ্যমন সুমায় পুলিশ আসি হাজির। পুঁটিমারির নৃপেন রায়রে স্বামী সাজাই নিয়া গেনু। উয়ায় তো তামান কাগজ পত্তর আছে, খাঁটি ইন্ডিয়ার লক। পুলিশ কিচ্চু মানল না। বলল- বউর ভোটার কাড দেখাও। র্যা শন কাড দেখাও। কেডা জনি রিপোট করি দিছিল পুলিশে। বউডা তখন ব্যথায় ছটফট করয়্যা মরে। জানো দাদা, টানা হিঁচড়ায় বউডা তামান লকের সামনে বিয়াইয়া দিল। শ্যাষে মা-ব্যাটারি লইয়া যমে মানসি টানাটানি।’
বাবা কোনো উত্তর দ্যায় নাই। কী-ই বা দিবে এসবির, মোগো লগে কম হইছে। তোর দাদু শুদা হুঁকা টানি গেইল।
ময়না খুড়া আবার কইতে লাগল-‘আমাগো কিচু হউক আর না হউক ভোটার কাড, আধার কাড হইছে। জন্ম ভিটায় আছি। মোরা পখির মতো যেহানে ইচ্ছা উড়য়্যা জাইতে পারি। দাদা এ্যকটা কতা কও তো, তমরা ইন্ডিয়ায় আইল্যা ক্যা?’
হুঁকা টানতে টানতে বাবা বলল-‘মোরা নাকি ইন্ডিয়ার লক।’
-‘ইটা কী আর হাচা। হামেরাও তো ইন্ডিয়ার প্যাটের মধ্যি থাকতাম। লকে টিটকারি দিত বাংলাদেশী ছিটমাল বলে। তাই বইল্যা মোরা বাংলাদেশী হইয়া গেছি? এপারের এ্যাকটে মানসিও ওপারে যাবার জইন্নি লিস্টিতে নাম না লিখাইল, না গেইল।’ বাবার মুখ তখন ধুঁমায় ঢাইক্যা আছিল। অস্পষ্ট স্বরে কইল-‘পৈঞ্জা, এ্যখন ল্‌।’
বাপ বেটা দাঁড়িয়ে আছে ভাটির টানে বয়ে যাওয়া নদীর দিকে মুখ করে। পৈসাঞ্জু ছেলেকে জড়িয়ে ধরল। তার বুকের মধ্যে শুকনো বালির মতো গড়িয়ে পড়ছে ভাঙ্গন। সে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল-এই নদীতে এ্যাখনও দুই চাইরডা কাছুয়া আছে। হেদিন আমাগো সামনি এ্যাকটে কাছুয়া হুস করি জলের উপর উঠিল। উয়ায় দেখিয়া বাবা জল ছুঁইয়া কইল, ‘ওরে কাছুয়ারে, দেখয়্যা আইস মোর আঙা গাই কেমন আছে।’ মোর মুক্তিযোদ্ধা বাপের চোখের জল টপ টপ করি নদীর জলে ঝরয়্যা পড়ছিল। নদীতে তখন সিঙ্গিমারি, জলঢাকা, ধরলা না শুদাই বা্পের চোখের জল মুই নাগাল পাছিলাম না। আগে যদি বুঝতাম, বাবার মনে এ্যাতো দুঃখু তাহলি এদ্যাশে আইতাম নাই!
-তুমি বুঝতি চাও নাই বাবা। দাদু কতো কইল, ‘হামেরা যাইম ক্যানে? তম্‌রা যাতি হয় জাও। তমার মা’রে আর মোরে রাখি জাও। মুই এই মটিতে জন্মিছি, এই মটিতেই মরমু।’ তুমি বাবা, জ্যাদ ধরল্যা, দাদুরে রাইখ্যা কিছুতেই ইন্ডিয়ায় আসবা না।
-তুইও কস, মোর দোষ?
-তোমার এ্যকার কতা না বাবা, নয়শো বাইশটা লোক ইন্ডিয়া আইল ওপারের ছিটমহল থাকি। নাম লিখাইয়াও আরো সাতান্নজন মানসি শ্যাষবেলা আসে নাই। থাকি গ্যাল আমাগো দেশে। মুই কোনো দিন বুঝি নাই, মোরা আসার জইন্নি ক্যান এ্যাতো উতালা হয়ি মরিনু।
ছেলে এমন প্রশ্নে মিয়ে গেল পৈসাঞ্জু। বুকে হাহাকার আরো চেপে বসল। শেষে মরিয়া হয়ে বলল-পৌষা, ঝিমলির কতা মনে পড়ে তোর?
-ক্যান মনে পড়বে না বাবা। ছোটবেলা থাকি অমন কতো ঘটনা দ্যাখছি। আমাগো ছিট তো আসলে ছিল মুক্তাঞ্চল। লাশ পড়লিও শিয়াল কুত্তা ছাড়া কেউ আইত, কও?
পৈসাঞ্জু হতবাক, ছেলেটা কতো বড় হয়ে গেছে! ছেলেকে নতুন করে কিছু বলার নেই, গোটা গ্রামের সামনেই ঘটেছিল নারকীয় ঘটনাটা। জিল্লুর খাঁ’র পোষা ছেলেরা পৈলান ডাকুয়ার সতেরো বছরের মেয়ে ঝিমলিকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। পৈলান নাকি জিল্লুর খাঁ’র মুখেমুখে তর্ক করেছিল রিক্সা ভাড়া নিয়ে। যুবলীগ নেতার কাছে ছিটমহলের মানুষের ভাড়া চাওয়াটাই তো অপরাধ, আবার মুখেমুখে তর্ক করার দুঃসাহস? পৈলান বুঝেছিল শাস্তি কারে কয়, মেয়ের উপর সাত সাতটা ষন্ডা প্রকাশ্যে ধর্ষণ চালাল। মেয়েটা নিতে পারেনি এতো্গুলো পশুর কামনা-চাপ। পুকুর পাড়ে তিনদিন লাশ পড়েছিল। দারোগা গোঁফ পাকাতে পাকাতে বলেছিল, ‘লাশ তো পড়ছে ইন্ডিয়ায়, তোমাগো ইন্ডিয়া যাইয়া কেস করো। এ্যখানে বাল ছিঁড়তে আইছ? যত্ত সব বেওয়ারিশের দল।’ পৈসাঞ্জু বিড়বিড় করে বলল-ছিটমহলে জন্মালিও কেউ হিসাব রাখে নাই, আর মরলিও কেউ হিসাব রাখে নাই। সত্যই তো মোরা বেওয়ারিশ লাশের মতো জীবিত মানসি।
[আরও পড়ুন: রবিবারের ছোটগল্প দখল লিখেছেন ইভান অনিরুদ্ধ ]

-বাবা, ছিটমহল উঠি যায়ে এ্যখন তো আর আগের মতন নাই। ওপারে নাকি ভাল কাজ চলছে।
-শগল কী আর পালটি গেইছে! আস্তাঘাটে মালাউন গালি শুনলে বুকের মধ্যি কেমন শূন্যি শূন্যি লাগত। বাংলাদ্যাশের বেবাক হিন্দু তমান সুময় অস্থির হয়ি থাকে, নিরাপত্তার অভাবে ভোগে। বাংলাদ্যাশ ছাড়ি হাজার হাজার হিন্দু গোপনে পালায়। ভাবলাম আমাগো জেবন তো গেইছে, তুই হিন্দু দ্যাশে মাথা তুইল্যা বাঁচ।
-বাবা, চৈতা বর্মন হিন্দু, মোরাও নাকি রাজবংশী হিন্দু। তাই বইল্যা কি ছাড়ি কতা কইল? মোরা ইন্ডিয়ার মানসি, ইন্ডিয়ায়ই এ্যখন উদ্বাস্তু।
-ঠিক কইসু পৌষা। মোর বাপ প্রায় পাগল হয়ি গেইছিল। বাপ খামারে জন্মাইছে বলি ঠাকুর্দা নাম রাখছিল খামারু। আবার অঁয়টে ছিল বেয়াল্লিশের আকালের বছর। গারামে গারামে সাদা চামড়ার সাহেবরা লঙ্গরখানা খুলিছিল। কৃষিমেলা ক্যাম্পের আন্না ঘরডারে বাবার ত্যামন লঙ্গরখানা মনে হইত। মাঝে মাঝে কইত, ‘মুই খামারু হই কি করয়্যা? মোর আর খামার নাই, পুকুর নাই, আকাশ নাই। মুই জন্ম থাকি সারা জেবন তো শুদা আকালু।’
আকাশ ফর্সা হয়ে উঠেছে। এক ঝাঁক পাখি কোয়াক কোয়াক ডাকতে ডাকতে নদী বরাবর বাংলাদেশের দিকে উড়ে গেল। পাখিদের সীমান্ত সমস্যা নেই, কাঁটাতারের বেড়া নেই। হঠাৎ করে যেন নদীতটের আড় ভেঙে গেল। নদীর ওপাড়ে বেশ কয়েকটি তামাকপাতা বোঝাই ভ্যান, গুটিকয়েক যাত্রী এসে হাজির। মাঝি মাল্লার হাকডাক পড়ে গেছে। দিনের প্রথম মাড় ছাড়ার প্রস্তুতি চলছে। পাটিকাবাড়ি ঘাটে চায়ের দোকানিরা কাঠের চুল্লিতে আগুন দিয়েছে। একাটা বাসের হেডলাইট দপ করে জ্বলে উঠল। আলোতে পৌষাল সতর্ক হয়ে উঠল-রাইত পোহাতে আর দেরি নাই। দাদুরে চরত্‌ পাইলাম না। চলো বাবা, বাস ধরি ফিরি। ক্যাম্প জাগার আগে যাতি হবে। অবস্থা বুঝয়্যা আবার হামেরা খুঁজতি জাইম। যাওয়ার আগে বাবা, একটা কতা কও, দাদু যে বাংলাদেশে যাতি পারে কী করি বুঝল্যা।
পৈসাঞ্জু চুপ করে রইল। পৌষাল তাড়া লাগাল- কী হইল, কও।
সে ধীরে ধীরে বলল-তুইও জানস; লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নীলফামারি, কুড়িগ্রাম জিলা থাকি আসা ছিট-মানসিরে তিনটে ক্যাম্পে রাখা হইছে। দহলা খাগড়াবাড়ি, কুচলিবাড়ি, পানিশালার মতো অনেকগুলা ছিটমহলের মানসিরে রাখছে উত্তর বড় হলদিবাড়ি ক্যাম্পে আর বেরুবাড়ির দিকের মানসিগো রাখছে মেখলিগঞ্জের ভোটবাড়ি ক্যাম্পে। হামেরায় কুড়িগ্রাম জিলা মানসিগো কৃষিমেলা ক্যাম্পে। তামান মানসি কতো আশা নিয়া এপারে আইছে। এ্যখন তো সবাই কয় জমি জিরাত কিছু দিবে না। পায়রার খোপের মতো এ্যাকটে করি বাড়ি বানাইয়া দিবে আর দুই বছর র্যা শন দিবে। খয়রাতি দিয়া মোগো ভিক্ষুক বানাবে। এতেও মানসি পখির মতন পোষ মাইন্যা যাচ্ছিল। কিন্তুক বিনিময় লকরার বাঁধ ভাঙল যখন ধরলার পাড়ে ঘর বাড়ি বানাতি গেইল সরকার। বিক্ষোভে বিক্ষোভে মেখলিগঞ্জ ভোটবাড়ি ক্যাম্প জুড়ি এ্যখন যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। উমুরা ভাঙ্গনের মুখি কিছুতেই জাবেক নাই। অনেকগুলান মানসি আবার বাংলাদ্যাশে ফিরে যাইতে চাইছে। কিন্তুক বিনিময় মানসের কথা কেডা শোনে? ধরলা ওখানে তামান জিনিস গিলয়্যা নেয়। ঘরহারা মানসেরে আবার ভাঙ্গনের মুখি ঠেলি দিবে শুনি বাবা ক’দিন ধরি ক্যামন জনি পাগল পাগল করইল। সারাক্ষণ ছটফট করত আর মোকে জিগাইত, ‘এ্যই পৈঞ্জা, ক’ ক’ উয়ারা ধরলার চরে ফাঁন্দে পড়িছে? হি হি হি… মোরা সব বগা, বুঝলি নালচে বগা. . ধরলার চরত্‌ ফান্দেঁ পড়া বগ…’
কৃষিমেলা স্টপেজে তারা নামতেই একটা লোক যেন মাটি ফুঁড়ে উদয় হল। কাছে এসে জিজ্ঞেস করল-আপনি পৌসাঞ্জু বাবু তো?
-না, মুই পৈসাঞ্জু রায়।
-ওই হলো, আপানাদের আমাদের সঙ্গে একটু যেতে হবে।
-কোথায় যাইম, ক্যানে যাইম?
-গাড়িতে উঠুন, যেতে যেতে কথা হবে।
ইতিমধ্যে ইউনিফর্ম পরা দু’জন পুলিশ পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, দেখে বাপ বেটার পিলে চমকে গেল। পুলিশের কাঁধে সেই আদ্যিকালের থ্রি নট থ্রি রাইফেল। ক্যাম্পের গায়ে দাঁড়িয়ে একটা পুলিশের জীপ। ভোরের নির্জনতা একটু আগেও ছিল, এখন আর নেই। দু’একজন করে ক্যাম্পের ঘুম ভাঙা বাসিন্দা জড়ো হয়েছে। ক্যাম্পে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে খবরটা, বাপ-বেটাকে পুলিশ অ্যারেষ্ট করেছে। পৈসাঞ্জুর মা চিল চিৎকার করতে ছুটে এল-অগো তমরা কোথায় নিয়া জান্‌? উমুরা কি করিসে?
সাদা পোশাকের ইন্সপেক্টর বলল-কিছু না, ওদের একটু পরেই দিয়ে যাব।
-না মুইও যাইম। বলেই বৃদ্ধা দেবারি প্রায় লাফিয়ে উঠে পড়ল জীপে।
জীপটা দিনহাটা থেকে রেল লাইনের প্রায় সমান্তরাল রংপুর রোড ধরে গীতালদা পৌঁছাল। গীতালদায় রেল লাইনটা দুম করে ছেদ হয়ে গেছে। বর্ডারে ধাক্কা খেয়ে মুখ থুবরে আছে অখণ্ড দেশের স্মৃতি। ওপারে বাংলাদেশ। আগে রংপুরের পেট চিড়ে ট্রেনটা ছুটে যেত শিয়ালদা। দেশভাগে ভাগ হয়ে গেছে রেল। গীতালদা থেকে জীপটা ডানে দিকে বর্ডার রোড ধরে পশ্চিম দিকে এগোল। কিছুদূর গিয়েই রাস্তা জোড়া জটলার কাছে দাঁড়াল জীপটা। বি.এস.এফে বি.এস.এফে ছলাপ। কাঁটাতারের ওপাশে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড। চূড়ান্ত উত্তেজনা। আধুনিক সব অস্ত্রপাতি নিয়ে দু’পক্ষ যুদ্ধের মূর্তিতে মুখোমুখি। উত্তেজনার মধ্যে চলছে ফ্লাগ মিটিং। কাঁটাতারের দু’পাশে উড়ছে ভারত-বাংলাদেশের পতাকা। পুলিশ ইন্সপেক্টর পৈসাঞ্জুদের বলল-গিয়ে দেখ লোকটাকে চিনতে পারো কিনা। ভীড় ঠেলে তাদের এগোতে বেগ পেতে হচ্ছে। কোলাহল ভেদ করে ছুটে আসছে উত্তপ্ত কথাবার্তা-নো নো। ইয়ে কোই ইন্ডিয়ান আদমি নেহি হায়্‌। ইয়ে বাংলাদেশ আন্ধার মে ছিটমহল কা আদমি।
-না, না। বাংলাদেশে কোন ছিটমহল নেই। আমরা কোনো অনুপ্রবেশকারির বডি নেব না।
সীমান্ত বেড়ার কাছে গিয়ে তাদের প্রাণের মধ্যে ছ্যাঁৎ করে উঠল। জটলার উৎসে খামারু রায়, লটকে রয়েছে কাঁটাতারে। তিনটি মানুষের অনুভূতিতে কামান বন্দুকের কোলাহল ছাপিয়ে নেমে এসেছে নৈঃশব্দ হাহাকার। পৈসাঞ্জুর ভিতরের মানুষটা ভেঙে খান্‌ খান্‌ হইয়ে যাচ্ছে, বাবার এই আবস্থার জন্য সে-ই তো দায়ী। সশস্ত্র প্রহরীরা তাকে ঝাঁঝরা করে দিক। দেবারির বুকের মধ্যে বোবা কান্নার উথালি পাথালি। স্বর বেরুচ্ছে না তার গলা থেকে। সে পাখির মতো দু’হাত তুলে লাগাল ছুট স্বামীর কাছে কিন্তু একজন বি.এস.এফ জওয়ান তার ডানা ধরে ফেলল।
পৌষালের শূন্য দৃষ্টি আটকে রয়েছে রক্তাক্ত কাঁটাতারে। দাদুর পা ভারতের মাটিতে আর তারের মধ্য দিয়ে মাথা গলে হাত ছুঁয়েছে বাংলাদেশ। আলগা হাতের মুঠো থেকে ঝরে পড়েছে খানিকটা মাটি। দাদু মাটিটুকু ছিটমহল থেকে এনেছিল। দাদুর সারিন্দাটা ঝুলে আছে কাঁটাতারে। শৈশব জুড়ে থাকা দাদু এখন তন্ত্রীতে বেঁধে দিচ্ছে সারিন্দার তার—আহারে কুংকুরার সুতা হলু লোহার গুনারে…
আরও পড়ুন: রবিবারের ছোটগল্প টুকুন ও লালপরী লিখেছেন রুনা তাসমিনা

Check Also

উপন্যাস খাতা ২য় পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস খাতা লিখেছেন দেবশ্রী চক্রবর্তী : পর্ব-২

ধারাবাহিক উপন্যাস খাতা দেবশ্রী চক্রবর্তী Illustration: Preety Deb রাত পৌনে বারোটা নাগাদ তিতির চার্চের সামনে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *