Breaking News
Home / রবিবারের আড্ডা / গল্প / রবিবারের ছোটগল্প প্রতিপক্ষ লিখেছেন পূজা মৈত্র

রবিবারের ছোটগল্প প্রতিপক্ষ লিখেছেন পূজা মৈত্র

রবিবারের ছোটগল্প

প্রতিপক্ষ

পূ জা মৈ ত্র

ছোটগল্প

Illustration: Preety Deb


আজাদগড় কলোনির সামনে থেকে টালিগঞ্জ মেট্রো যাওয়ার ফ্রিকোয়েন্ট অটো পাওয়া যায়। পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যে মেট্রো স্টেশন মহানায়ক উত্তমকুমার থেকে এসপ্ল্যানেড সৃজিতের রোজের যাত্রাপথ। রাইটার্সে কাজ করে ও। ক্ল্যারিক্যাল পোস্টে। বয়স বছর পঁয়ত্রিশ,মাঝারি উচ্চতা,মাজা গায়ের রং। দেখতে সাধারণ হলেও সাধারন নয়। একটা অসাধারণত্ব আছে, সেটা ওর দুটো চোখ। অসম্ভব দীপ্তিময় আর নজর কাড়া। ঐ চোখের দিকে নজর গেলে, মেয়েরা নজর করে। বিহ্বল হয়। মুচকি হেসে অ্যাডমায়ার করে। এছাড়া সবই সাধারণ সৃজিতের। গতে বাঁধা জীবন। আজাদগড় কলোনিতে এক-কামরার ফ্ল্যাট। মা-বাবা-বোন সিউড়ি থাকে। ফ্ল্যাটটা লোন করে কিনেছে। বছর পাঁচেক হয়ে গেল। বিয়ের পরপরই ফ্ল্যাটটা কেনা, লোনের মোটা অঙ্কের ই.এম.আই গুনতে হয়। তাই শৌখিনতার অবকাশ খুব কম। একসময় ভালো ছাত্র ছিল সৃজিত। ফিলোজফি অনার্স নিয়ে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ করেছিল। চাকরির পরীক্ষা দিতে শুরু করছিল তারপর। বছর তিনেকের চেষ্টায় এই চাকরিটা জোটে। পঁচিশ বছর বয়সে সরকারি চাকরি পেয়ে বন্ধুদের কাছে ঈর্ষনীয় হয়ে উঠেছিল হঠাৎ। সবাই বলেছিল আরো ভালো চাকরির জন্য খাটতে। সৃজিত আর ও যুদ্ধে যায় নি। যা পেরেছে, তাতে সন্তুষ্ট থাকা ওর মহৎ গুণ। এই অভ্যাসটা যে কোন নিম্ন মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে বড় হওয়া ছেলে মেয়েদের মজ্জাগত। ছোট থেকেই এই সন্তোষের সাধনা দেখে আসছে যে, বাবা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। খুব স্বল্প মাইনেয় চারজনের সংসার চালিয়ে এসেছেন। আতিশয্য যেমন ছিল না। তেমনি অভাবও ছিল না। তাই পি. এস. সি দিয়ে পাওয়া চাকরির স্কেলে সৃজিতের অসন্তুষ্ট হওয়ার প্রশ্নই ছিল না। তারপর যা হয়। ছেলে চাকরি পেয়ে গেলেই মা, বাবা বিয়ের জন্য পাত্রী খোঁজেন, আর তারপর-চার হাত এক হয়। সর্বানীর সাথে এভাবেই বিয়ে হয়েছিল সৃজিতের সাড়ে পাঁচবছর আগে।সর্বাণী তখন সদ্য এম.এ পাশ করেছে। ওর বিষয় ছিল ইংরেজী। ওর পরে আরো দুটো বোন। তাই বিয়ের জন্য তাড়াহুড়ো ছিল। সরকারি চাকুরে পাত্র পেয়ে হাত ছাড়া করতে চাননি ওর বাবা মা। সর্বাণীর ইচ্ছা ছিল বি.এড করবে। তারপর এস.এস.সি দেবে। সৃজিতেরও অমত ছিল না। কিন্তু তা আর হয়ে উঠল কই?
ফেসবুকের নোটিফিকেশনে আসে। মজ্ঞিমা মেসেজ করেছে। চেক করে সৃজিত, “আজ ঠিক পাঁচটায় পার্ক স্ট্রীট ম্যাট্রোর সামনে।”মুচকি হাসে সৃজিত। মজ্ঞিমা অধীর হয়ে উঠেছে। গত সপ্তাহে অফিস ট্যুরে ও শিলিগুড়ি গিয়েছিল। একসপ্তাহ সৃজিতের সাথে দেখা হয়নি। মজ্ঞিমা একটা ওষুধ কোম্পানিতে আছে। এরিয়া সেলস ম্যানেজার। কলকাতাতেই মূলত কাজ ওর। কিন্তু ট্রেনিং ছিল শিলিগুড়িতে। ট্রেনিং প্লাস আউটিং আর কি। মঞ্জিমা খুব এফিশিয়েনট মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সেই নিজের যোগ্যতায় প্রমোশন বাগিয়ে নিয়েছে একটা। খুব ভালো কথা বলতে পারে ও। মানুষকে মোটিভেট করতে পারে, ওর মত করে ভাবতে পারে। ডাক্তাররাও মোটিভেটড হয়ে যায় তাই। সৃজিতের ওকে ভালোলাগে ওর ওপেননেসের জন্য। মনে যা ভাবে মুখে তাই বলে। স্মার্ট। পাঁচ দুই উচ্চতা। তীক্ষ্ণ মুখশ্রী। ফর্সাই বলা চলে। খুব চটপটে। দ্রুত কথা বলে। সব কাজ তাড়াতাড়ি সারতে পছন্দ করে। আধুনিকার সমস্ত গুণ-ই ওর মধ্যে আছে। ফেসবুকে আলাপ। বছর দেড়েক হল। মাস কয়েক চ্যাট করার পর বন্ধুত্বের ধাপ পেরিয়ে দেখা করার প্রয়োজন অনুভূত হয়। বছর খানেক আগে প্রথম দেখার দিন থেকেই একটা স্পার্ক ফিল করে দুজনেই। সেই থেকেই নিয়মিত ডেটিং চলছে। এর মধ্যে বার তিনেক আউটিংয়েও গেছে দুজনে। মন্দারমণি, বকখালি, ডায়মন্ডহারবার। সৃজিত মজ্ঞিমার কাছ থেকে কোনো কিছুই লুকায়নি। মজ্ঞিমা জানে সৃজিত বিবাহিত। সর্বাণীর অবস্থাটাও ওর অজানা নয়। সব জেনে শুনেই সৃজিতের জীবনে এসেছে ও। জীবন সঙ্গিনী হতে চেয়েছে। আর মজ্ঞিমা আসারপর থেকেই সৃজিতের বাসি খাবারের মত পচে যাওয়া জীবনটা নতুন রং ফিরে পেয়েছে। বাঁচাটা নিতান্ত অভ্যাস হয়ে গেছিল বছর দুয়েক ধরে। বাঁচতে হয়। তাই বাঁচছিল সৃজিত। কয়েকটা দায়িত্ব, কর্তব্যের বোঝা বহন করে। নিজেকে ভুলে গিয়েছিল ও। নিজের চাওয়া পাওয়াকে ভুলে গিয়েছিল। আদৌ বেঁচে ছিল কিনা, সংশয় হয় এখন।

“তুমি এত ভুলো কেন বলত?” কসবায় নিজের ফ্ল্যাটের বেডরুমে খাটে বসে হতাস গলায় বলল মজ্ঞিমা। সৃজিত মানিব্যাগ হাতড়াল, “ছিল তো সত্যি বলছি। মজ্ঞিমা এমনিতেই রেগেছিল। এবার ফেটে পড়ল, “কোথায় গেল তাহলে? ডোন্ট টেল ইউ হ্যাভ ইউজড দ্যাট ফর ফাকিং ইওর ওয়াইফ? দ্যাট শো পিস?” সৃজিতের খারাপ লাগল।সর্বাণীর সম্পর্কে এরকম কথা কি করে বলতে পারল মজ্ঞিমা? ও-তো সমস্তটাই জানে। সর্বাণীর যে এস.এল.ই আছে। তাতে ওর দুটো কিডনিই অ্যাফোকটেড, গা-হাতে-পায়ের প্র্যত্যেকটা গিঁটে এত ব্যথা যে নড়তে চড়তেই পারে না। সর্বক্ষণের আয়া আছে। বাথরুম অবধি কোনোক্রমে যায়, এসবের কোনো কিছুই তো মজ্ঞিমার অজানা নয়। তাহলে হঠাৎ এরকম কথার অর্থ কি? এখনো কি ও সন্দেহ করে, সৃজিত সর্বাণীর সাথে… যে নিজেই জড় বস্তু প্রায় তার সাথে সঙ্গমের জন্য অভিযুক্ত করার অর্থ কি? বিয়ের বছর খানেকের মধ্যেই সর্বাণীর অসুখ ধরা পড়েছিল। জ্বর, গা হাত পা ব্যথা, সারা মুখে র্যা শ, মুখ ফুলে যাওয়া, সারে না সারে না করতে করতে ভেলোর নিয়ে গিয়েছিল সৃজিত। কলকাতার সব বড় বড় বেসরকারি হাসপাতাল ঘুরে অর্থদণ্ড দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল ও। ওখানেই আসল রোগটা ধরা পড়েছিল। সারেনা এই রোগ। জেনেটিক। সারা জীবন ওষুধের উপর থাকতে হয়। লম্বা ওষুধের তালিকা হাতে পেয়েছিল সৃজিত। তার সাথে একরাশ হতাশা। সর্বাণীকে ভালোবেসে ফেলেছিল ও। ভালোবাসার মানুষটা নিশ্চিৎ মৃত্যুর দিকে চলে যাচ্ছে, হয়তো বড়জোর বছর পাঁচেক আয়ু- এটা জেনে মনে অসম্ভব কষ্ট হয়েছিল তখন। বাড়ির সবাই বলেছিল,অসুখ লুকিয়ে বিয়ে দিয়েছে ওর বাবা-মা। তাই সর্বাণীকে বাপের বাড়ি ফেরৎ পাঠানো সৃজিতের আশু কর্তব্য। সৃজিতের মন মানেনি। একটা দায়িত্ববোধ ওর বিবেককে ঘিরে ধরেছিল। যে মেয়েকে অগ্নিসাক্ষী হয়ে সম্প্রদানের মাধ্যমে নিয়ে এসেছে, তার দায় ভার এড়াবে কি করে? সেই থেকে সর্বাণীর সমস্ত ভার একা বয়ে চলেছে সৃজিত। আয়া থাকলেও রাত বিয়েতে সৃজিতকেই উঠতে হয়। আয়া দিদির উপর মায়া হয় ওর। সারাদিন তো সে-ই সেবা করে, রাতেও যদি জাগতে হয়…। “এখন এমন সং-এর মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন? জামা কাপড় পরো। কন্ডোম না থাকলে অ্যাম নট গোয়িং টু টেক চান্স। এখন সুবোধ বালকের মত বাড়ি যাও। আর বউ-এর সেবা কর’’। মজ্ঞিমা অন্তর্বাস পরতে থাকে। সৃজিত অপমানিত হয়। কষ্ট হয় ওর। ও-তো আসতে চায়নি। মজ্ঞিমারই তো উৎসাহ ছিল।“এক সপ্তাহ হয়নি সৃজিত,আজ চলো… প্লিজ”। অপমানটা গিলল ও। জামা ,প্যান্ট পরে নিলো। মজ্ঞিমাকে কিছু বলা যাবে না। ও ছাড়া গতি নেই সৃজিতের। ডুবন্ত মানুষকে যে খড়কুটো জোগায়, তার কাছে চির ঋনী হয়ে যেতে হয়। অবদমনের অন্ধকূপে ডুবে থাকা সৃজিতকে তো মজ্ঞিমা অক্সিজেন জুগিয়েছে ওর সাথেই ভবিষ্যৎ জীবনটা কাটাবার স্বপ্ন দেখে সৃজিত। বিয়ে করতে চায় ওকে। শুধু সর্বাণীর চলে যাওয়ার অপেক্ষা। ধীর পায়ে চলে যেতে উদ্যত হল সৃজিত। “ইনজেকশনটা নিতে ভুলো না”। মজ্ঞিমা মনে করালো। ঘাড় নাড়লো। সব ভুললেও এটা ভোলা যাবে না। কসবা থেকে টালিগঞ্জ ডাইরেক্ট বাস পেয়ে গিয়েছিল সৃজিত। মজ্ঞিমা কাল-পরশু থাকবে না। ওর বাবার শরীর খারাপ বাড়িতে যেতে হবে। বাসে সিট পেয়েছিল একটা। জানলার ধারে একটা কলেজ পড়ুয়া ছেলে বসে আছে। গার্লফ্রেন্ডকে ফোন করছে। ফিসফিস করে কথা বলছে। একটা কথা কানে এলো সৃজিতের, “আরে বাবা, ডোন্ট টেক এনি রিস্ক। আই-পিল খেয়ে নাও একটা, কিছু হয়ে গেলে?” সৃজিত ছেলেটাকে নজর করল আঠারো কি উনিশ হবে। দাড়ি গোঁফ এখনো নরম হয়ে রয়েছে। মায়াবী দুটো চোখ, ইনোসেন্ট মুখটা, পিঠে ব্যাগ, টিউশন পড়ে ফিরছে মনে হয়। নাকি টিউশনের নাম করে…আজ কাল দুনিয়া বড্ড এগিয়ে গেছে। ক্যাজুয়াল সেক্সকে ক্যাজুয়ালি নিতে জানে আজকালকার ছেলে মেয়েরা। মজ্ঞিমা এরকম কঠোর ব্যবহার করল কেন কে জানে! একদিন তো ভুল হতেই পারে। পরে পিল খেয়ে নিতো না হয়। তা বলে এতটা এগোবার পর কেউ প্রত্যাখান করে! শরীরটা অস্থির লাগছে। মনটাও চঞ্চল। বাড়ি ফিরতে ইচ্ছা করছে না। ওর এখন যা চাই, সেটা বাড়িতে পাওয়া যাবে না। রাস্তায় যে কিনে নেবে, সে চিন্তাও মনে আনেনি কোনোদিন। আজ মনে হচ্ছে, মধ্যবিত্ত ইনহিবিশনগুলো জঞ্জালের মতো। ডাস্টবিনে ঝেড়ে ফেলে দিলেই হয়। ছেলেটার মোবাইলে স্ক্রিনে একঝলক চোখ পড়ল। পর্নো দেখছে। যথাসম্ভব লুকিয়েই দেখছিল। বাসটা হঠাৎ ব্রেক কষতে বেসামাল হয়ে গেছিল। ছেলেটা বুঝতে পারলো, সৃজিত দেখে ফেলেছে। অপ্রস্তুত হল না। স্মার্ট হাসি হাসলো একটু। সৃজিতই লজ্জায় চোখ ফেরালো। জেনারেশন ওয়াই এদেরই বলে। পর্নো দেখেই মনটা আবারো চঞ্চল হয়ে উঠলো। সর্বাণীর কথা মনে পড়লো হঠাৎ। সুস্থ সর্বাণীর কথা। ওদের বিয়ের পরের দিনগুলোর কথা। সৃজিতের চাওয়াতেই ওর চাওয়া ছিল। কোনোদিন না করেনি, প্রতিহত করেনি, প্রত্যাখ্যান তো দূরের কথা।

মেট্রোর উল্টোদিকে বাস থেকে নেমে পড়লো সৃজিত, অটোর লাইন বেশ লম্বা। “আজাদ গড়?’’ প্রশ্ন করল সৃজিত। গড়িয়ার অটোও এখানে থেকেই পাওয়া যায় “রানী কুঠি,রানি কুঠি’’ অটোটা ডাকছে। একটা সিট ফাঁকা। দৌড়ে গিয়ে বসে পড়ে। রিজেন্ট কলোনীর মুখে নামল। অ্যাপোলো ফার্মেসী। ওখানেই ইনজেকশনটা পাওয়া যায়। পাড়ার ফার্মেসীতে এতো দামী ইনজেকশন রাখে না। মজ্ঞিমার দৌলতে একজন ডাক্তারের প্রেক্সক্রিপশনেও পেয়ে গেছে। এরা আবার প্রেক্সক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বেচে না। দিন পনেরো ধরে রোজ একটা একটা করে ইনজেকশন কেনে সৃজিত। অফিস থেকে ফেরার পথে। প্রতি রাতে সর্বাণীকে নিজে হাতে ইনজেকশন দেয়। আয়া দিদি ঘুমিয়ে পড়লে, তারপর। মজ্ঞিমা বলেছে, এভাবে চললে বড়জোর তিনমাস। তারপর সর্বাণীর যন্ত্রণা শেষ হয়ে যাবে। বিলটা মিটিয়ে খুচরোটা গোনে সৃজিত। তিন টাকা। নাভি কাট হয়ে যাবে একটা। পান বিড়ি সিগারেটের দোকান থেকে একটা নেভি কাট কিনে ধরিয়ে নেয়। ধীর পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে তারপর। সর্বানী জন্যে একটা ভিটামিন ইনজেকশন। এটা দিলেই তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবে ও। ইনজেকশনটা দিলে সর্বানীর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
“লাগল?”
“না।”
সৃজিত সিরিঞ্জটা বার করে নেয়। স্পিরিট মাখানো তুলো চেপে ধরে।
“জানো, আজ একা একা বাথরুমে গেছি। দিদিকে ধরতে হয়নি’’। একটা আশার আলো দেখতে পাচ্ছে যেন সর্বাণী।
“বাঃ। ইনজেকশনটা কাজ দিচ্ছে তাহলে’’।
“একদম। তোমার বান্ধবীকে থ্যাংক্স বলো। ও-সত্যিই খুব ভালো একটা কাজ করেছে।’’
সৃজিত সর্বাণীর কাছ থেকে জানতে চায়, “আজ ইউরিন ঠিকঠাক হয়েছে তো?’’
“অনেকটা হয়েছে। মাঝখানে একদম হচ্ছিল না। এই ইনজেকশনটার পর থেকেই…”। চোখ সরায় সৃজিত। সর্বাণীর সাথে চোখ মেলাতে পারে না। একটা গ্লানিবোধ ওর আত্মাকে গ্রাস করে মুহুর্তের জন্য। পরমুহুর্তেই নিজেকে সামালে নেয় সৃজিত। সর্বাণীর যন্ত্রণা চোখে দেখা যায় না আর ডাক্তারের হিসাবে আরো দেড় বছর…চলে তো ওকে যেতেই হবে। সৃজিত নিজের পাপবোধকে এই ভেবে কমাতে চায়ছেও অবসম্ভাবীকে তরান্বিত করছে মাত্র। এতে সর্বাণীরও যেমন মুক্তি, তেমন সৃজিতেরও। মুক্ত হয়ে সব দায় ঝেড়ে ফেলে বাঁচতে পারবে ও। মজ্ঞিমার সাথে। নিজের ভবিষ্যতের সুখের স্বপ্ন সৃজিতের মনকে দৃঢ় বাঁধনে বাঁধে। না, এভাবেই চালাতে হবে ওকে। যতদিন না সর্বাণী একেবারে শেষ হয়ে যায়।

“দিদি শুয়ে পড়েছ?’’ সর্বানী কণ্ঠ জড়ানো গলায় বলে। সৃজিত ঘরে এসেছিল। আজ বড্ড গরম। পাঞ্জাবীটা ছাড়ে, “হ্যাঁ। শুয়ে পড়তে বললাম।’’
“তুমি ঠিক করে খেয়েছ তো?” সৃজিত সর্বাণীর টেনশানটা বোঝে,
“হ্যাঁ। তোমার জ্বর মনে হচ্ছে?’’ কপালে হাত ঠেকায় সৃজিত। গা বেশ গরম।
“ঐ একটু।’’সর্বাণী লুকায় ।
“দিদিকে বলোনি কেন?”
“আর কত জ্বালাব”
…সৃজিত মেডিসিন কোওটোটা সর্বাণীর শিয়রের কাছে রাখা টুল থেকে নিয়ে আসে। প্যারাসিটামল নেয় একটা, বলে, “খেয়ে নাও’’। সর্বাণী কষ্ট করে উঠে বসে। সৃজিত জল দেয়। গ্লাসে করে। অতি কষ্টে ঢোক গেলে সর্বাণী শুয়ে পড়ে তারপর। সৃজিত ইনজেকশনের অ্যামপুলটা হাতে নেয়। ভাঙে। সিরিঞ্জটা সর্বাণীর মাথার কাছের টুলেই রাখা থাকে। সৃজিত ইনজেকশণের অ্যাম্পুলে সিরিঞ্জটা ডোবায়। অভ্যস্ত হাতে ভরে নেয়।
“ইনজেকশন দেবে?”
“নিয়ে তো ভালোই ছিলে এই কদিন আজকে না হয় জ্বরটা এসেছে”।
সৃজিত ইনজেকশন দেওয়ার ব্যাপারে কোনো গাফিলতি চায় না, বলে, “তা ঠিক”। সর্বাণী হাত বাড়িয়ে দেয় পরম ভরসায়। “আজ এই হাত?” সৃজিত বলে। সর্বাণী ঘাড় নাড়ে, “কাল ডান ছিল, আজ বাঁ”
…“বেশ।” স্পিরিট ঘষে সৃজিত। সর্বাণীর মুখের দিকে তাকায়। মুখের ফোলা ভাবটা মাসখানেক হল নেই। রাশগুলোও একটু কম। সর্বাণীর বিশ্বাস-ই কি তাহলে জিতে যাচ্ছে? নাকি প্রদীপ নিভে যাওয়ার আগে দপ করে জ্বলে ওঠে। এটা সেরকমই কিছু। ইনজেকশনের সিরিঞ্জটা ঢোকায় সৃজিত। ধীরে ধীরে প্রবেশ করায় সর্বাণীর শরীরের মধ্যে। আস্তে করে গরল ঢালে সৃজিত। ধীরে ধীরে মৃত্যুর দরজার দিকে ঠেলে দেয় সর্বাণীকে। ধিরে কিন্তু নিশ্চিত ভাবে।
“একটু লাগল না?” সিরিঞ্জটা বার করতে করতে বলে সৃজিত। “না।” সর্বানী কষ্টটা চেপে যায়। সৃজিত ওর চোখের কোনো থেকে ঝরে পড়া জল আলতো হাতে মুছে দেয়। “সব কষ্ট ঠিক হয়ে যাবে”। মিষ্টি হাসি হাসে সৃজিত। সর্বাণী সৃজিতের হাত জড়িয়ে ধরে, “ঠিক বলছ? তাড়াতাড়ি সেরে যাব তো?”
“খুব তাড়াতাড়ি।” সৃজিত সর্বাণীর হাতে আর এক হাত দিয়ে মৃদু চাপ দেয়।
“সারলে যে আমার অনেক কাজ”
সৃজিত থমকায়, “কি কাজ”?
“ঘর, সংসার কিছুই তো সামলাতে পারি না। সারলে গুছিয়ে সংসার করব। তোমার যত্নও করতে পারি না। তোমাকে কোনো সুখই তো দিতে পারি না”। সৃজিত অবাক হয়,
“তার জন্য আক্ষেপ হয় তোমার?”
সর্বাণীর চোখ দিয়ে জল ঝরে পড়ে। বলে,
“হবে না? আমি তো জানি তুমি কেমন। সুস্থ থাকতে কতটা চাইতে আমায়। অসুস্থ হয়ে থেকে তোমায় তো সেই সুখটুকুও দিতে পারি না আমি। আমি জানি, তোমার কষ্ট হয়। অথচ আমার জন্য…”সৃজিতের অপরাধ বোধ ওকে চুপ করিয়ে রাখে। সর্বাণী তো মজ্ঞিমার কথা পুরোটা জানে না। কেবল জানে ফেসবুকের বান্ধবী। মজ্ঞিমার সাথে প্রথমবার মন্দারমনি গিয়ে আড়ষ্ট হয়েছিল সৃজিত। বারবার মনে হচ্ছে সর্বাণীকে ঠকাচ্ছে। মজ্ঞিমা ওকে সব ভুলিয়ে দিয়েছিল। এখন মজ্ঞিমার সাথে সঙ্গম করলে সর্বাণীর কথাটা মাথাতেও আসে না। মজ্ঞিমা সেদিন পরনারী ছিল। আজ আপনার হয়ে গেছে। তাহলে একঘরে, একখাটে যে নারী শরীরের সাথে বছরের অধিকাংশ রাত পাশাপাশি যাপন করে, সে কে? আপন? না পর? নাকি আপন হয়েও পর…
“ওসব ভেবো না। আমি খুব ভালো আছি। তুমি তাড়াতাড়ি সেরে ওঠো তো’’। সৃজিত উঠে দাঁড়ায়। সর্বাণীর অপরাধবোধ, গ্লানি ওকে চুপ করিয়ে দেয়। গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ে ও। সৃজিত বেসিনে যায়।

[ আরও পড়ুন: রবিবারের ছোটগল্প কাকতালীয় লিখেছেন মোহাম্মদ জসিম]

ভোরবেলা ঘুম ভেঙ্গে যায় হঠাৎ। অদ্ভুত স্বপ্ন দেখছিল একটা। সৃজিত স্বপ্নের অর্থ বোঝে না। স্বপ্নের প্রথম ভাগে সর্বাণীকে রমন করছিল সৃজিত। সেই আগেকার মতো করে। সর্বাণী তখনকার মতই সুস্থ, স্বাভাবিক,সৃজিতের সব চাওয়াতেই সায় ছিল ওর। হঠাৎ সর্বাণী বদলে যায়। ঠিক এখনকার মতো হয়ে যায়। অসুস্থ, শয্যাগত। তবুও সর্বাণীর মুখে তৃপ্তির হাসি লেগে থাকে। যেমন তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠতো। সৃজিতের সাথে সহবাসের পর-ঠিক একই তৃপ্তির হাসি সর্বাণীর ঠোটের কোনে দেখে অবাক হয় সৃজিত। কিসের এত তৃপ্তি ওর? সৃজিত তো অনেক দূরে। ওকে ছুঁয়েই নেই। সর্বাণীর শরীরের মধ্যে থাকা তো দূরস্থান। সর্বাণীর হাতের দিকে নজর পড়ে সৃজিতের। ইনজেকশনের সিরিঞ্জটা ধীরে ধীরে সর্বাণীর শরীরে প্রবেশ করছে। ওর ধীর অথচ নিশ্চিত প্রবেশেই তৃপ্ত হচ্ছে সর্বাণী। ওর মুখে সেই চেনা হাসি ফুটে উঠেছে। সিরিঞ্জটাকে তো সৃজিত প্রবেশ করাচ্ছে না। তাহলে? একা একাই ঢুকে যাচ্ছে ও। সর্বাণীর ত্বক, চর্বি ভেদ করে মাংসের মধ্যে। মুখ ঢোকাচ্ছে সর্বাণীর গভীরতায়। নিজের সবটুকু ক্ষরণ উদ্গীরণ করে নিজেকে শূন্য করছে। সর্বাণীকে ভরিয়ে তুলছে অনাগত সম্ভবনায়। তারপর আপনা আপনিই বেরিয়ে যাচ্ছে সর্বাণীর শরীর থেকে। দরদর করে ঘামতে থাকে সৃজিত। এ কেমন স্বপ্ন? ইনজেকশনের সিরিঞ্জটা তো জড়। ও কেন পুরুষের মত আপন ইচ্ছায় নারী শরীরে প্রবেশ করবে? ওর প্রবেশ নারী তৃপ্ত হবে কেন? সিরিঞ্জটার প্রবেশের ভঙ্গিও খুব সতর্ক। খুব ধীর। কিছুতেই আহত করতে চায় না প্রিয় নারীটিকে। দরদর করে ঘামছে টের পায় সৃজিত। খাট থেকে নামে। সিরিঞ্জটা গেল কোথায়? টুলটাতেই তো রেখেছিল। চমকে ওঠে সৃজিত, সিরিঞ্জটা সর্বাণীর মাথার কাছে এল কি করে? ক্যাপটাও লাগানো নেই! সে কি! সৃজিতের স্পষ্ট মনে আছে, নিজ হাতে সিরিঞ্জটাকে ক্যাপ লাগিয়ে টুলে রেখেছিল। তাহলে…তাহলে কি…না, না। মনের ভুল। সৃজিত সিরিঞ্জের ক্যাপ লাগায়। টুলে রেখে দেয়। নিজের ভাবনায় নিজেই অবাক হয়। একটা সিরিঞ্জকে সর্বাণীর প্রেমিক ভাবছে ও। নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছে। কারণটা হৃদয়ঙ্গম করতে দেরি হয় না। সর্বাণীর শরীর বহুদিন পায়নি ও। সেই অতৃপ্তিই উদগ্র বাসনা হয়ে ওকে এসব ভাবিয়েছে। যৌন ঈর্ষা একেই বলে। তা বলে জড় বস্তুর প্রতিও…
রাতের ঘটনাবলী মনে করার চেষ্টা করে সৃজিত। না। ও টুলেই রেখেছিল সিরিঞ্জটাকে। তাহলে? তাহলে টুলটা আর একবার দেখে সৃজিত। সিরিঞ্জটা ওখানেই আছে। তার পাশে? তার পাশে ওটা কি? চমকে ওঠে সৃজিত। কন্ডমের প্যাকেট? এটা তো মানি ব্যাগে ছিল। এখানে কি করছে? এটাই তো কাল হারিয়ে গেছিল। বড্ড অবাক হল সৃজিত। এসব কি ঘটে চলেছে চারদিকে? কনডোমের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে দেখল ও। ব্যবহৃত নয়। এই যা বাঁচোয়া। কিন্তু এটা এখানে এল কি করে? প্যাকেটটা হাতে নিয়ে বসে থাকে সৃজিত।

“টুকটুকি ফোন করেছিল” স্নান করে ঘরে এসেছিল সৃজিত। অফিস যাওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছিল। টুকটুকি সর্বাণীর মেজবোন। “কি বলল?” সর্বাণীর মুখের হাসি বলে দিচ্ছে বেশ ভালো খবর। “গুড নিউজ আছে। টুকটুকি প্রেগন্যাণ্ট”। ধাক্কা খেল সৃজিত। এই তো বছর খানেক আগে বিয়ে হল ওর। এর মধ্যেই? অবশ্য এটাই তো স্বাভাবিক। সর্বাণী সুস্থ থাকলে, এতদিন ওদের ছেলেমেয়ের বয়স তিন চার বছর হয়ে যেত। “ও”। সৃজিত সংক্ষিপ্ত জবাব দিল। “কত ভালো খবর বলো ত?” সর্বানী উঠে বসল। সৃজিত উত্তর দিল না। “স্বর কমল?” সর্বাণী সৃজিতের মনের ভাব বুঝল। সৃজিত ওদের অপূর্ণতা নিয়ে ব্যথিত। এই বুঝেই চুপ করে গেল। “হ্যাঁ”। সৃজিত শার্ট পরল।
“আজকে আসতে দেরি হবে?”
“না। তাড়াতাড়ি আসব”।
“ইনজেকশন আনবে”?
সর্বাণীর কথায় খটকা লাগল সৃজিতের।
“হ্যাঁ কেন”?
সর্বাণীর মুখে হাসির আভা দেখা দিল। ভারী অবাক হল সৃজিত। ইনজেকশন আনা হবে শুনে এত আনন্দ কিসের? তাহলে সর্বাণীর কি ভালোলাগে, সিরিঞ্জটা যে ভাবে ওর শরীরে প্রবেশ করে, যেটুকু যন্ত্রনা দেয়- যেভাবে নিজেকে রিক্ত, নিঃস্ব করে সবকিছু ওকে দিয়ে দেয়? সর্বাণীও কি তাহলে সিরিঞ্জটাকে…
“ওষুধটা পড়লে ভালো থাকি তো…”
সৃজিত উত্তর দিল না। শুধু ভালো থাকার জন্যই কি? নাকি ভালোলাগার জন্যও। একটা অস্বস্তি বুকের ভেতর দলা পাকাচ্ছিল কিছুক্ষণ ধরে। সেটা আরও গাড় হল যেন।

মজ্ঞিমা কথাটা শুনেই ভীষণ রেগে গেল, “হোয়াট? কি বলছ এসব?”
সৃজিত ঢোক গিলল , “না মানে- ইনজেকশনটা নিয়ে ও বেশ ভালোই আছে। ব্যথা কম ইউরিন ঠিকঠাক হচ্ছে, রাশ নেই”
…“তাই বলে ইনজেকশন বন্ধ করে দিতে হবে?” সৃজিত সেটাই চায়। যেনতেন প্রকারন ইনজেকশনের সিরিঞ্জটাকে সর্বাণীর থেকে দূরে রাখতে চায়। মজ্ঞিমার কাছে অনুমতি চাইছে মাত্র। সত্যিটা বলা যাবে না, তাই মিথ্যা বলেই… “তোমাকে আমি মলিকিউলটার মেকানিজমটা বোঝায়নি? অ্যাপারেন্টলি ভালো রাখবে। দেখে মনে হবে পেশেণ্ট সুস্থ, অথচ ভেতর থেকে হার্টটাকে অকেজো করে দেবে, হার্ট! ওষুধটার সম্পর্ক হার্টের সাথে? সিরিঞ্জের নিঃসরণ সরাসরি সর্বাণীর হৃদয়ে পৌছয় তাই, “কিন্তু এ ছাড়া উপায় নেই? কোনো মেডিসিন…”.
“ইনজেকশনের কাজ কি মেডিসিনে হয়? তোমার কি মতলব বলো তো? যতটা পারো ডিলে করতে চাইছ, তাই না? যে কদিন বেশি বাঁচে সর্বাণী ততই তোমার ভালো। বাহ। বেশ। তাহলে থাকো তোমার বৌকে নিয়ে। তিনমাস সময় আছে তোমার কাছে। তার মধ্যে সর্বাণীর কিছু না হলে বাবা- মায়ের পছন্দের পাত্র দেখে বিয়ে করে নেব আমি”। ফোনটা কেটে দিয়েছিল মজ্ঞিমা। সৃজিতের হেল্পলেস লাগছিল। ইনজেকশন বন্ধ করলে মজ্ঞিমা রাগ করবে। আবার ইনজেকশন চালিয়ে গেলে সিরিঞ্জটা সর্বাণীকে ভোগ করবে। কি যে করে ও…

“মিঃ বসু, আপনার ওয়াইফের এ মাসের ব্লাড রিপোর্ট বেশ ভাল। ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন যথেষ্ট কমছে। গতমাসেই ভাবছিলাম ডায়ালিসিসটা আর এড়ানো যাবে না। কিন্তু এ মাসে পরিস্থিতিটাই ঘুরে গেছে। গ্রেট সাইক্লোস্পো-রিমে কাজ দিয়েছে তাহলে।” ডাঃ গাঙ্গুলীর চেম্বারে বসে আনএক্সপেকটেড কথা গুলো শুনেও সৃজিত মাথা ঠাণ্ডা রেখে ভাবলেশ মুখে প্রশ্ন করল, “তাহলে আশার আলো”…“অফ কোর্স। হান্ড্রেড পার্সেণ্ট আছে। একই ওষুধ চালিয়ে যান। সামনের মাসে চেকআপে আনবেন”। ফি দিয়ে বেরিয়ে এল সৃজিত। মজ্ঞিমা বলছিল ভালো হবে, অ্যাপারেণ্টলি ভালো হবে। তাবলে ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন-এ এত উন্নতি? সর্বাণী জীবনে ফিরে আসছে কি তাহলে? সৃজিত তো তা চায় না। তাহলে কার চাওয়াতে ফিরছে ও? একটা উদ্যত সিরিঞ্জ চোখের সামনে দেখতে পেল সৃজিত। ক্যাপখোলা। সর্বাণীর শরীরে প্রবেশের জন্য ব্যাকুল। কামার্ত পুরুষের মত অধীর। ওর জন্য- ওর জন্যই কি?

সৃজিত ড্রিঙ্ক করেছিল আজ। হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে অর্পনের সাথে দেখা হয়ে গিয়েছিল। এখন খুব বড় ব্যাবসা করছে অর্পন ইমপোর্ট এক্সপোর্ট কলেজের সময়কার বন্ধু। এখন গড়িয়ায় ফ্ল্যাট কিনেছে। জোর করে একটা বারে নিয়ে গেল। ইউজুয়ালি সৃজিত ড্রিঙ্ক করে না। তবুও অর্পনের সাথে এক পেগ দু পেগ করতে করতে চার পেগ হয়ে গেছে। নেশাটা ধরেছে বেশ। পা টলমল অর্পন ওর গাড়ি করে ফ্ল্যাটের নিচে ড্রপ করে দিয়ে গেছে। সৃজিতের বেশ ভালো লাগছিল। সব টেনশন গুলো ওর মাথা থেকে ভ্যানিশ হয়ে গেছে যেন। টলমল পায়েই ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকল সৃজিত। বেসিনে চোখে মুখে জল দিল। বাথরুমে গেল। তারপর দিদিকে, বলল খাবো না বাইরে খেয়ে এসেছি”। টলতে টলতে বেড রুমে গেল সৃজিত। ঢুকে যে দৃশ্য দেখল তাতে সব নেশা উবে গেল ওর। সর্বাণী নিজের হাতে সিরিঞ্জটা নিজের শরীরে ঢোকাচ্ছে। চোখ বুঁজে। আস্তে আস্তে করে। প্রথমে যন্ত্রণায় মুখটা একটু বেঁকে গেলেও পরমুহুর্তেই ভালো লাগছে ওর। মুখটা হাসিতে ভরে উঠছে। তৃপ্ত হচ্ছে ও। পূর্ণ হচ্ছে। সৃজিত স্খলিত কণ্ঠে বলে উঠল, “সর্বাণী…” সর্বাণী নেশাভরা চোখে তাকাল। “চলে এসেছ? তোমার দেরি দেখে ইনজেকশনটা একাই নিয়ে নিলাম। টাইম ওভার হয়ে যাচ্ছিল। “তুমি কি ভাবে দাও দেখে দেখে শিখে নিয়েছি। কাল ভাগ্যিস একবারে চারটে অ্যাম্পুল এনেছিলে’’। রোজ রোজ কিনলে দোকানদার বিরক্ত হচ্ছিল। তাই একবারে চারটে অ্যাম্পুল কিনেছিল কাল। প্রশ্ন এড়াবার জন্য। “খুব ভালো ইনজেকশন জানো? শরীরটা খুব ভালো লাগছে। ডাক্তার কি বলল? রিপোর্ট ভালো?” সর্বাণীর কথায় সৃজিতের কান ছিল না। ও একদৃষ্টে সিরিঞ্জটাকে দেখছিল। সর্বাণীর হাতে ধরা রয়েছে এখনো। উদ্ধত হাসি হাসছে। যেন বিদ্রুপ করছে সৃজিতকে। সর্বাণীকে থামাতে হবে। ওকে বোঝাতে হবে সিরিঞ্জটা ভালো নয়। সর্বাণীকে ভোগ করছে সুকৌশলে। “সিরিঞ্জটা রাখো…” সর্বাণী অবাক হল। ওর গড়িমসিতে সৃজিত ওর হাত থেকে সিরিঞ্জটা কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল।“আর এই ইনজেকশন নেবে না তুমি”।
“কেন? নিয়ে তো ভালো আছি। নেব না কেন”?
“তুমি বুঝবে না’’ সৃজিত জোর দিল,
“তাও তুমি নেবে না”। সর্বাণী উঠে দাঁড়াল,“কেন? তুমি চাও না আমি সুস্থ হই”? সিরিঞ্জটাকে কুড়িয়ে নিল ও। সযত্নে তুলে রাখল। “তুমি জানো না পুরো ব্যাপারটা…যা জানো না”।
সর্বাণী মিষ্টি হাসল, “আজ আমি খুব সুস্থ। গত তিন বছরে কখনো এত সুস্থ বোধ করিনি। আমায় দেখেও বিশ্বাস হচ্ছে না? আমি সুস্থ বুঝেই তো এটা এনেছ তুমি’’। সৃজিত চমকে উঠল। কণ্ডোমের প্যাকেটটা সর্বাণীর হাতে গেল কিকরে? সকালেই তো ম্যানিব্যাগে ভরে ছিল। সৃজিতের গলা জড়িয়ে ধরল সর্বাণী।
“কি গো? চুপ করে গেলে যে? কি ভাবছ? আগে তো এমন ছিলে না। যা চাও তা বলতে জানতে। এখন নতুন নতুনদের মতো আকারে ইঙ্গিতে … কেন বলো তো?’’ কণ্ডোমের প্যাকেটটা হাতে নিলো সৃজিত।
“তুমি ঐ সিরিঞ্জটাকে ফ্যালো আগে সর্বাণী। ওটা…” থমকাল সৃজিত। সত্যি বলা ছাড়া উপায় নেই। সত্যিটা ওকে বলতেই হবে। ওটা যে ভিটামিন ইনজেকশন নয়, বিষ- তা না জানালে সর্বাণীর মোহ দূর হবে না। কনফেস করতে হবে ওকে। এখনি। “তুমি এটা ফ্যালো”। সর্বাণী কণ্ডোমের প্যাকেটটা ফেলে দিল। “এসবের কি দরকার? টুকটুকি মা হবে- ঐ টুকু মেয়ে- আর আমি দেখব”?সৃজিতকে বাহু বন্ধনে টেনে নিল সর্বাণী। “কিন্তু সর্বাণী- সিরিঞ্জটা…” সৃজিত কে আর কিছু বলতে দিল না সর্বাণী। সর্বাণীর মধ্যে প্রবেশ করতে করতেও সিরিঞ্জটাকে লক্ষ্য করল সৃজিত। স্থির, শান্ত হয়ে শুয়ে আছে। ও জানে ওরও পালা আসবে।
আরও পড়ুন: রবিবারের ছোটগল্প দখল লিখেছেন ইভান অনিরুদ্ধ

Check Also

অমিতাভ দাসের ছোটগল্প

রবিবারের ছোটগল্প শূন্য থেকে শুরু লিখেছেন অমিতাভ দাস

ছোটগল্প শূন্য থেকে শুরু অমিতাভ দাস Illustration: Preety Deb একটা লোক সেই থেকে চিৎকার করেই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *