Breaking News
Home / বিবিধ / বাপ্পাদিত্য দাসের সাক্ষাৎকার : প্রথম দশকের তরুণ কবি বাপ্পাদিত্য দাসের মুখোমুখি শূন্য দশকের কবি জুবিন ঘোষ

বাপ্পাদিত্য দাসের সাক্ষাৎকার : প্রথম দশকের তরুণ কবি বাপ্পাদিত্য দাসের মুখোমুখি শূন্য দশকের কবি জুবিন ঘোষ

কবিতা যাপনের মুদ্রিত দলিল : বাপ্পাদিত্য

১৯৯০ সালে জ্ন্ম পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার মঠ-চণ্ডীপুর থানার অধীনস্ত, রায়চক গ্রাম থেকে লেখালিখি করেন পেশায় ইঞ্জিনিয়ার বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, একেবারেই তরুণ কবি বাপ্পাদিত্য দাস। ক্ষেপচুরিয়াস এবং হৃৎপিণ্ড পত্রিকার সঙ্গে সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হিসাবে রয়েছেন তো বটেই এছাড়া বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় সুনামের সঙ্গে লেখালিখি করছেন এই স্বভাবে লাজুক তরুণ কবি। লেখালিখির প্রতি অসীম ভালোবাসা এই কবি নিজেকে একজন পরম দীক্ষিত পাঠক হিসাবেই দেখেন। একটা সাক্ষাৎকার কবি জীবনকে হয়তো বদলে দিতে পারে না, কিন্তু নিজের সামনে অনেকগুলো প্রশ্নের সম্মুখীন সে হয়। এই প্রশ্নগুলো বহুদিন বাপ্পাদিত্যের মনে ঘুরঘুর করতে দেখেছি, হয়তো প্রশ্রয় পায়নি বলেই উত্তরগুলোর সন্ধানও করেনি। এবারে সেই সব প্রশ্নেরই অপকট উত্তর দিলেন মেধাবী এই তরুণ কবি। কবির সাথে আড্ডা দিলেন কবি জুবিন ঘোষ।
সাক্ষাৎকার
জুবিন ঘোষ : কবির সাক্ষাৎকার মানেই তো কবিতার থেকে কবিকে বেশি গুরুত্বদান। কবির কি আদৌ নিজের কবিতা সম্পর্কীত কোনও প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া উচিত? কবির সম্পর্কে গবেষণায় পাঠকের কী লাভ হয়? তাহলে কবি আগে নাকি কবিতা আগে? তোমার কাছে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ? কবিতা নাকি কবি? কেন?

বাপ্পাদিত্য : অবশ্যই কবিতা। দেখো তুমি প্রথমেই বললে, কবির সাক্ষাৎকার মানে কবিতার থেকে কবিকে বেশি গুরুত্বদান। তাই কি? মনে হয় না। তুমি একজন কবির কাছে বা স্রষ্টার কাছে কেন যাবে? তার কবিতা বা সৃষ্টির গুরুত্ব তোমার কাছে আছে বলেই। তাই তো? এবং তুমি তাকে কী প্রশ্ন করবে? তার সৃষ্টি বা কবিতা কেন্দ্রিক যে রহস্য বা অজানা দিক তোমাকে তোলপাড় করছে সেগুলোইতো। নাকি? তার মানে দেখ সৃষ্টি গুরুত্ব না পেলে স্রষ্টাও গুরুত্ব পাবে না। আর সাক্ষাৎকারের সময় তুমি যে প্রশ্ন করবে তা খেয়াল করে দেখো সৃষ্টির আদলে স্রষ্টাকে ছোঁয়া। কবিতার কবিতা সম্পর্কীত কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া উচিত কি অনুচিত সেটা প্রশ্নের উপর নির্ভর করছে।
সাক্ষাৎকার
জুবিন : কবিতা লেখার ক্ষেত্রে স্বকীয়তা আর স্বতস্ফূর্ততার মধ্যে কোনটিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছ?

বাপ্পাদিত্য: অবশ্যই স্বতঃস্ফূর্ততাকে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে যা-ই এসেছে তাই রেখেছি কবিতার শরীরে। এরকম অনেকবারই হয়েছে কোনো কবিতা এমনভাবে এলো তাতে অগ্রজ বা সমসাময়িক কবির কোনো লাইন এসে গেছে। এদিক ওদিক একটু পরিবর্তন করে নিজের কবিতার লাইন হিসেবেই রেখে দিতে পারতাম। কিন্তু অমি তা করি না। ওই লাইনটা হুবুহু এক রাখি ইনভাইটেড কমার মধ্যে। আর অমার মনে হয় স্বতস্ফর্ত আর স্বকীয়তা একে অপরের পরিপূরক। তবে এটাও ঠিক লেখার ধরনের রিপিটেশন আমার একেবারেই না-পসন্দ।

জুবিন : অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে তোমার কবিতাকে স্লাইডে ফেললে দেখেছি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তোমার কবিতায় ব্যবহৃত শব্দ ও বাক্যগুলো বিশেষ সাঙ্কেতিক, ঋজু অথচ সরল ভাষারীতির। যা পাঠকমনষ্কে সহজাতভাবে স্থায়িত্ব অর্জন করতে পারে। কবিতার প্রসঙ্গ আসলেই অনেকেই ছন্দ নিয়ে নাক সিঁটকান। অনেকে ভবেন ছন্দ মাত্রই আধুনিকতার পরিপন্থী, আধুনিক কবিতায় অন্ত্যমিলের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে এসেছে। ছন্দ এবং দশক- এই দুটো বিষয় নিয়ে তোমার কী পর্যবেক্ষণ?
বাপ্পাদিত্য : “অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে তোমার কবিতাকে স্লাইডে ফেললে দেখেছি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তোমার কবিতায় ব্যবহৃত শব্দ ও বাক্যগুলো বিশেষ সাঙ্কেতিক, ঋজু অথচ সরল ভাষারীতির যা পাঠকমনষ্কে সহজাতভাবে স্থায়িত্ব অর্জন করতে পারে।” জুবিনদা, তোমায় অনেক ধন্যবাদ অমার কবিতা ও কবিতার চলনকে এতটা নিখুঁতভাবে পর্যায়লোচনা করার জন্য। আমি নিজেও জানি না এসব আছে কিনা? তোমার এই পর্যায়লোচনার চোখ দিয়ে পাঠক হিসেবে দেখব সত্যি এরকম কিছু অছে কিনা? ওই যে আগেই বললাম সচেতনভাবে কিছুই করি না। যেভাবে আসে সেভাবেই থেকে যায়। আমার মনে হয় না ছন্দ, অন্ত্যমিল অধুনিকতার পরিপন্থী। মনে হয় না এর থেকেও আরও উপযুক্ত হয় যদি বলি বিশ্বাস করি না। আমি নিজে যখন কবিতা লিখতে এলাম তখন ছন্দ বিষয়ে কিছুই জানি না, আক্ষরিক অর্থেই মূর্খ। তবে ইদানীং ছন্দ পেয়ে বসেছে। এখন নতুন নতুন ছন্দ শিখছি। শেষ এক বছর ধরে শুধু ছন্দেই লিখছি। কবিতার আধুনিকতা ছন্দ বা অন্তমিল থাকা না থাকার উপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে ভাবনা, শব্দচয়নের কবিতার চলনের উপর। দশক একটা হিসেবের জন্য বা একজন কবি কোন সময়ে বসে লিখছে এইটুকু একটা ধারণা পাওয়ার জন্যই ঠিক অছে। এর থেকে একে নিয়ে বেশি মাতামাতি না করাই ভালো। কে কখন লিখছে বা কতদিন ধরে লিখছের থেকেও কী লিখছে সেটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দশক নিয়ে অহেতুক মাতামাতিতে বিশ্বাসী নই।

জুবিন : বাংলা কবিতায় ‘ইজম’ প্রবণতা ও কবিতা আন্দোলনগুলোকে কীভাবে দেখো? কোনও বিশেষ কবিতা আন্দোলনের প্রতি কখনও বাড়তি আকর্ষণ বোধ হয়েছে?

বাপ্পাদিত্য : বাংলা কবিতার ইজম প্রবণতা বা বিভিন্ন কবিতার আন্দোলনের কথা যদি বল তাহলে সেটা যে যার নিজস্ব ভাবনা ও দর্শন সেটাকে ছোট করা বা অপমান করার কোনো অধিকার আমার নেই। তবে আমার কাছে কবিতা লেখা ও পড়া দুই ব্যক্তিগতভাবে মুহূর্ত বিশেষ ও নিজেকে খুঁজে পাওয়া। ‘ইজম’ বা কবিতার অন্দোলন আমার কবিতা পড়া বা লেখার উপর বিশেষ প্রভাব ফেলে না। পড়ার বা লেখার সময় এরকম কোনো ভাবনাও কাজ করে না। তবে বিভিন্ন ‘ইজম’ বা আন্দোলনের কবিতার ধরণ, বৈশিষ্ট্য- সেই বিষয়ে জানতে ভালো লাগে। এইটুকুই।

জুবিন : তোমার ‘নাবিক ও মোহনার হরিধ্বনি’ বা ‘সেইসব ফিরে আসা’ কবিতাদুটির পাঠের প্রাক্‌মুহূর্তের প্রস্তুতি দীর্ঘতর; তার কৃৎকৌশল, গূঢ়ার্থমূলক ব্যঞ্জনা পাঠকদের কাছে ভিন্নতর অভিজ্ঞান ও মায়াবী নির্মিতি হয়ে ধরা দেয়। তোমার সাম্প্রতিক কবিতার এই অভিযোজন পর্বে কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছো?

বাপ্পাদিত্য : সেইভাবে সচেতনভাবে কিছু প্রস্তুত করিনি বা করছিও না। আসলে আমার লেখা অমার ভাবনা ও জীবনযাপনের মুদ্রিত দলিল। তাই জীবন এবং তার পারিপার্শিক পরিস্থিতি যখন যেভাবে বাঁক নিয়েছে, বদল নিয়েছে কিংবা তোমার ভাষায় অভিযোজিত হয়েছে লেখাতেও তার ছাপ সমানুপাতিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। বিশেষ কোনো প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়নি।

জুবিন ঘোষ : সার্বিক একরৈখিক কবিতা নাকি বহুতানিক নির্মাণশৈলী, কোন ধরনের কবিতা তুমি সমর্থন করো?

বাপ্পাদিত্য : দুটো-ই। ওই যে বললাম, কবিতা জীবনের মুদ্রিত দলিল। জীবন তো আর সবসময় সরলপথে একরৈখিকভাবে চলে না। যখন চলে তখন লেখা সরল ও একরৈখিক হয়। যখন জীবনে অনেক লেয়ার চলে আসে, কিছুতেই একটা পথ দিয়ে উপসংহারে পৌঁছানো যায় না তখন লেখা অবধারিতভাবে বহুতানিক জীবনের প্রতিফলন বহন করে।

জুবিন : তোমার কবিতায় যৌনতার উপর একটা রক্ষণশীল মোড়ক আছে। কবিতায় শ্লীল-অশ্লীল-যৌনতা –এগুলো কি তুমি অসমর্থন করো? এ- বিষয়ে তোমার অভিমত কী?

বাপ্পাদিত্য : রক্ষণশীল মোড়ক সচেতনভাবে নয়। মানুষের প্রকৃতি তার লেখার প্রকৃতির গতিবিধিকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করে বলে আমার মনে হয়। আমি প্রকৃতভাবে আড়াল রাখতে পছন্দ করি বলেই হয়তো কবিতায় সরাসরি যৌনতার কথা আসে না, কিছুটা রূপকভাবে আসে। তবে যৌনতা মানে শুধু রগরগে শব্দের ব্যবহার নয় কিন্তু। তার বহিঃপ্রকাশ অনেকভাবেই হতে পারে। একটাও রগরগে শব্দ না ব্যবহার করেও নিজেকে উন্মুক্ত করা যায় নদীর প্রবাহের মতো সাবেকী ঘরানায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে দ্বিতীয় ধারাকেই পছন্দ করি। কবিতায় শ্লীল-অশ্লীল-যৌনতা– এগুলোকে আমার অসমর্থন করার কিছু নেই। কিন্তু তার ব্যবহার যথাযথ হওয়া বাঞ্জনীয়। অযথা নিজেকে আধুনিক বা অনাধুনিক কিংবা ডোন্ট কেয়ার প্রমাণ করতে এই শব্দগুলোর যথেচ্ছ ও অপটু ব্যবহার একদমই সমর্থনযোগ্য নয়। তাতে কবিতাটি দমবন্ধ করে আত্মহত্যা করে। সিনেমা, কবিতা বা যে কোনো শিল্পে নু্ডিটি তথা যৌনতা ব্যবহারের জন্য শিক্ষা লাগে অগাধ। সেটা ভুললে চলবে না।

জুবিন : কবিতা নিয়ে অনেকদিন কাজ করছ তুমি, এতগুলো বছর পেরিয়ে আসার পর প্রকরণ, বোধ ও নির্মাণ, কাকে কবিতার মূল গতিজাঢ্য মনে হচ্ছে ?

বাপ্পাদিত্য : অবশ্যই বোধ। আমার কাছে কবিতা বোধ আর দর্শনের মিশেল হিসেবেই ধরা দেয়। কোনো কবিতা লেখার ঠিক আগে আমি লক্ষ্য করে দেখেছি একটা ঘোর আসে এবং সেটা বোধে জারিত হয়। এরসঙ্গে দর্শন মিশে একটা পরিপূর্ণ কবিতা হয়ে ওঠে। এটা অমার নিজস্ব কবিতা হয়ে ওঠার পদ্ধতির কথা বললাম। বিভিন্ন জনের ক্ষেত্রে এটা বিভিন্ন হতে পারে। আর আমার মনে হয় বোধের ছাতার নিজে প্রকরণ ও নির্মাণ পারস্পারিকভাবে বেড়ে ওঠে।

জুবিন : কবিতায় ডি–স্টাকচারাইজেশন নিয়ে তোমার কি মতামত?

বাপ্পাদিত্য : অত কিছু বুঝি না। কবিতা নিয়ে ভাঙাচোরা আমি সমর্থন করে এসেছি। তবে সেই সঙ্গে এটাও খেয়াল রাখা জরুরী ভাঙাচোরা করতে গিয়ে যেন কবিতাটি-ই না হারিয়ে যায়।

জুবিন : প্রত্যেক কবির নিজস্ব একটা বিশ্বাস থাকে, তোমার নিজস্ব কবির বিশ্বাস কখনও কোথাও কি কোথাও টলে গেছে মনে হয়েছে?

বাপ্পাদিত্য : ভালো কাজও সৎ কন্ট্রিবিউশনের কোনো বিকল্প ছিল না, নেই এবং থাকবেও না। বাকি যা কিছু তা মুখে রং লাগিয়ে কলকাতার ফুটপাথে কিছু সময় মুজরো করে বেড়ানো। ফুটপাথের তো মাঝে মাঝে বিনোদন লাগে, নাকি? এই বিশ্বাস থেকে যে কখনোই টলে পড়ার মতো সম্ভাবনা তৈরি হয়নি, তা নয়। কিন্ত স্নান করে রোজ চুলে চিরুনী দেওয়ার জন্য একবার অন্তত আয়নার সামনে দাঁড়াতেই হতো। ছোটবেলার এই বদঅভ্যেস আমাকে এই সম্ভাবনার হাত থেকে বাঁচিয়েছে। সুতরাং…

জুবিন : একজন কবি হওয়ায় তোমার অবস্থান ও প্রতিবাদের ভাষার মধ্যে কি কোথাও কোনও বাধা খুঁজে পাচ্ছ? একজন শিল্পী কি এই বাধা মেনে নেবেন?

বাপ্পাদিত্য : না। প্রতিবাদ বা নিজের অবস্থানকে অলাদাভাবে দেখছি কেন ? আমি মানুষটাই তো সব মিলিয়ে। তার মধ্যেই তো রাগ, হিংসে, জ্বালা, প্রেম, ভালোবাসা, যৌনতা সব অছে। আর আমি কাউকে জবাব দেওয়ার জন্য বা কোনো ঘটনার প্রতিবাদ করার জন্য সবসময় কবিতাই আনতে হবে এরকম বিশ্বাস আমার নেই। প্রতিবাদ করতে হলে সরাসরি করব সব সময় কেন কবিতার আড়াল নিতে হবে? কবিতা আমার কাছে সমস্ত আমির ভেতর ঘটে চলা বিক্রিয়া প্রণালী।

জুবিন : আদৌ কবিদের সামাজিক দায়িত্ব বলে কিছু হয় কি? সামাজিক কনট্রিবিউশনকে কীভাবে দেখতে চাও? আরও স্পষ্টভাবে, কবিদের সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে তোমার কী অভিমত?

বাপ্পাদিত্য : কবি শিল্পী। তার আগে তিনি একজন মানুষ। কারোর প্রেমিক, কারোর প্রেমিকা, ভাই, বোন, মেয়ে, ছেলে ইত্যাদি। সুতরাং সে সমাজের বাইরের কেউ নয়। সুতরাং তার দায়িত্ব থাকবে। আসলে দায়িত্ব আর চাপিয়ে দেওয়া এই দুইয়ের ভেতর আমরা প্রায় গুলিয়ে ফেলি। সমস্যাটা সেখানেই হয়। কবির হয়তো নিশ্চয় কিছু সামাজিক দায়িত্ব থাকতে পারে। ঠিক নিশ্চিত নই। কিন্ত কবি যে সাংবাদিক নয় কিংবা প্রতিটা ঘটনার বিশ্লেষক নয় এটুকু নিশ্চিত করে বলা যায়।

জুবিন : সমসাময়িক কাদের কবিতাকে তোমার ভাোল লাগে? এবং কেন? যাঁদের কবিতা ভালো লাগে সুস্পষ্ট নামোল্লেখ করতে অনুরোধ করছি।

বাপ্পাদিত্য : খুব সৎ ভাবে বললে আমার সমসাময়িক পড়ার হারটা কম। তা ছাড়া শেষ নয় দশ মাস আমি বিভিন্ন কারণে ডিস্টার্ব ছিলাম। তাই কোনো কিছুই পড়তে বা লিখতে মন লাগতো না। আসলে পারিপার্শ্বীক নানা টানাপোড়নে সবকিছুর উপর বিশেষ করে সাহিত্যের উপর একটা বিতৃষ্ণা জন্মে ছিল কোনো এক বিশেষ কারণে। এখন অনেকটা শান্ত হয়েছি। অবার কাজে ও পড়াশুনোয় ফিরছি।

জুবিন : তোমার কবিতা লেখার পেছনে কি কোনও অনুপ্রেরণা আছে? এই কবিসত্তার পেছনে কার ভূমিকা বা কোন ভূমিকা সব থেকে বেশি বলে মনে হয়?

বাপ্পাদিত্য : অবশ্যই আছে। তবে এককভাবে কেউ নয় বা কিছু নয়। এভাবে কার সবথেকে বেশি ভূমিকা বলা মুশকিল। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অনুপ্রেরণা থেকে কবিতা এসেছে। সেটা হতে পারে কখনও কোনো মহিলা, হতে পারে কোনো পুরুষ কিংবা হতে পারে একটা নিছক সন্ধেবেলা বা একটা ট্রেনের জানালা। অনেক, অনেক কিছু।

জুবিন : অনেক অগ্রজ কবির সঙ্গে কাজ করেছো। কোথাও আদর্শবিচ্যুতি ঘটেছে বলে মনে হয়েছে? হলে আদর্শগত ফারাকটা কোথায়? কোথাও কি মনে হয়েছে সেই কবিটির কবিতা লেখার কোনও প্রয়োজন নেই?
বাপ্পাদিত্য : আদর্শ বিচ্যুত হওয়া তাও নেওয়া যায় বা নিতে নিতে সয়ে গেছে। কিন্ত আদর্শের নামাবলী গায়ে ভণ্ডামি আরও ভয়ঙ্কর। এরকম অনেক পরিচিত মানুষকে দেখেছি। কবিতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে অবার সেই কবিতা নিয়ে নোংরা রাজনীতি, লবি করতে তাদের রুচিতে বাঁধে না। হ্যাঁ। মনে হয়েছে সেই কবিটির আর কবিতা লেখার প্রয়োজন নেই। একবার নয়। বহুবার।

জুবিন : প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা বলতে তুমি কী বোঝো? সেখানে তোমার অবস্থান কোথায়?

বাপ্পাদিত্য : এগুলো আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে গিমিক মনে হয়। আমি ভালো কিছু কাজ করতে চাই। এরকম প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠান বিরোধীতত্ত্বে আমার আস্থা নেই। বিশ্বাসও নেই।

জুবিন : কবিতা কি হিংসা থামাতে সক্ষম?

বাপ্পাদিত্য : না থামাতে পারে না। কারণ যারা হিংসা ছড়ায় তারা কবিতার এক অলোকবর্ষ দূর দিয়েও যায় না।

জুবিন : তোমার রাষ্ট্রীয় নাগরিকসত্তা, বাঙালিসত্তা এবং কবিসত্তার ও ব্যক্তিসত্তার মধ্যে কোনও রকম অন্তর্দ্বন্দ্ব খুঁজে পাচ্ছ কি?

বাপ্পাদিত্য : না। ওই যে বললাম কবিতা অমার কাছে সমস্ত আমিসত্তার ভিতর ঘটে চলা নিরন্তর বিক্রিয়াপ্রণালী।

জুবিন : কবি হিসেবে নিজেকে ঠিক কোন জায়গাটায় দেখতে চাও?

বাপ্পাদিত্য : গন্তব্য কোনদিনই আমার কাছে পরিষ্কার ছিল না, বা করতে চাইওনি। তাই “আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ”।

জুবিন : তোমার কাছে কবিতা মস্তিষ্কগত ক্ষরণ নাকি হৃদয়ের সরণ? কীভাবে?

বাপ্পাদিত্য : হৃদয়ের মস্তিষ্কগত ক্ষরণ। যা হৃদয়গত তাকে বুদ্ধিদীপ্তভাবে বলা।

জুবিন : ক্ষেপচুরিয়াস পত্রিকা এবং হৃৎপিণ্ড পত্রিকারও তুমি সম্পাদকমণ্ডলীর একজন। দুটি ভিন্নধর্মী পত্রিকার ক্ষেত্রে আলাদাভাবে তোমার কী দায় অনুভব করো?

বাপ্পাদিত্য : আলাদাভাবে নয় বরং যৌথভাবে যে দায় অনুভব করি তা হল পত্রিকাদুটির সুস্থতা ও রোগহীন সুঠাম শরীর।

জুবিন : বিষাদ থেকে, অপূর্ণতা থেকে, না পাওয়ার জানালা থেকেই কি কবিতারা উঠে আসে?

বাপ্পাদিত্য : অনেকাংশেই ঠিক। তবে আরও অনেক ফ্যাক্টর কবিতার জন্ম দেয়।

জুবিন : ফেসবুকে একদল মানুষ যারা দিনভর পাঠক সেজে মন্তব্য করছে ও ঘুরছে এবং সন্ধ্যাবেলা কবি সাজছে। তাদের সম্পর্কে তোমার কী মতামত।

বাপ্পাদিত্য : এই জায়গাটা নিয়ে আমি সত্যি খুব গোলমেলে। একটা সময় আমি ফেসবুকে লেখা পোস্ট করতাম। লাইক বা কমেন্টের তীব্র আকাঙ্খা নিয়ে বসে থাকতাম। রোজ তিন-চারবার বা তারও বেশি চেক করতাম। তারপর কেন জানি না আস্তে আস্তে এসব খুব ফলস মনে হতো। মুখ ফেরাই। অনেককেই দেখছি মুখ ফেরাতে। মাঝখানে শুনেছিলাম একজন বিখ্যাত কবি নাকি জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য লাইকও কমেন্টের এজেন্ট পুষতেন। সত্যি কিনা জানি না। এরকম শোনার পর আর এ বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই।
বাপ্পাদিত্য
জুবিন : কবিতা দিয়ে পাঠকের কাছে পৌঁছনো কি সহজ? তোমার কী মনে হয়?

বাপ্পাদিত্য : হ্যাঁ। অবশ্যই। যদি কবিতা পাঠকের কাছে পৌঁছতে হয় তাহলে তো কবিতার বিকল্প কোনো অবলম্বন আছে কি? গল্পের পাঠকের কাছে গল্প, সিনেমার দর্শকের কাছে সিনেমা। এটাই তো বিশ্বাস করে এসেছি। শুধু বিশ্বাস নয় এধারণা বদ্ধমূল হয়েছে। আর যদি বিকল্প পথ খোঁজো তা হলে ওই জোরপূর্বক সঙ্গম করে সন্তান প্রসবের মতো। হয় মায়ের মৃত্যু না হয় সদ্যজাতটি অচিরেই পক্ষাখাতে দেহ রাখবে।

শেষবেলায় কিছু র্যাধপিড ফায়ার। এক কথায় তোমার মূল্যায়ণ দাও।

জুবিন ঘোষ : কবিতা কী?
বাপ্পাদিত্য : না জানার মধ্য দিয়ে জানতে থাকা।

জুবিন : কবিতা – প্রতিভা নাকি চর্চা?
বাপ্পাদিত্য : দুইয়ের মিশেল।

জুবিন : ভালো কবিতা-খারাপ কবিতা সম্পর্কে…
বাপ্পাদিত্য : সেভাবে সার্বিকভাবে কিছু হয় না। ভীষণভাবে ব্যক্তি ও মুহূর্ত বিশেষ।

জুবিন : ভালো কবি হতে গেলে…
বাপ্পাদিত্য : ভালো তেল দেওয়া শিখতে হবে।

জুবিন : কবিতা মূর্ত না বিমূর্ত?
বাপ্পাদিত্য : মূর্তের মধ্য দিয়ে বিমূর্ততা কিংবা বিমূর্তের মধ্য দিয়ে মূর্ততা।

জুবিন : বাংলা কবিতার প্রকাশক সম্পর্কে?
বাপ্পাদিত্য : অনেকের কাজের নিষ্ঠার কাছে মাথা নত করি আর বাকিদের ক্ষেত্রে দাদা, দিদি, বনু, ভাইয়া কবিতার বাইরে করলে বাংলা কবিতা আরও সাবলম্বি হতো।

জুবিন : তুমি কি কাউকে তেল দাওনি?
বাপ্পাদিত্য : দিয়েছি। নিজেকে।

জুবিন ঘোষ : কবিতার শত্রু ?
বাপ্পাদিত্য : কবিরাই।

জুবিন : কবিদের দলভুক্তি– ইতিবাচক নাকি নেতিবাচক ?
বাপ্পাদিত্য : ভাগাভাগির ভয়ঙ্কর আগুনে বাংলার থেকে অনেকেই বা বেশি হাতপুড়িয়েছে! এরপর আর এই প্রশ্নের কি উত্তর হতে পারে?

জুবিন : সম্পাদকের কবিতা সংশোধন – উচিত নাকি অনুচিত?
বাপ্পাদিত্য : অবশ্যই করতে পারেন তবে কবিকে জানিয়ে বা কবির অনুমতি নিয়ে।

জুবিন : তোমাকে ধন্যবাদ বাপ্পাদিত্য, অফুরন্ত শুভেচ্ছা রইল। ভালো থেকো।

কবি বাপ্পাদিত্য দাস-এর চারটি কবিতা

কবিতা বিষয়ক আমি


খাতার শরীরে জ্বর নামছে। এবার সে আসবে। আমার অভিশপ্ত এই জীবনে কবে যে সে বাস্তুসাপের মত ঢুকে পড়েছিল টের পাইনি । আমিও আর তাকে বের করিনি। কারণ – আমি তো জানি বাস্তুসাপকে মেরে ফেলা বাস্তুর পক্ষে কতটা ক্ষতিকারক। আজ না হয় কাল সে ঢুকতই। ছিদ্র যখন ছিল ।

এক সর্বনাশী হাওয়ায় আমি উড়ছি। চাকরি নেই, অন্ন নেই, শুধু পথভ্রষ্ট ঠোঁটের মত আমি আশ্রয় খুঁজি গলায়, নাকে, কানে ও চিবুকে। কিন্তু একটা ঠোঁটের প্রকৃত আশ্রয় তো আর একটি ঠোঁট। লড়াই জমে উঠতে পারত ভেতর ভেতর শুম্ভ–নিশুম্ভের। শরীরের প্রান্তে এসে দাঁড়ায় ভিখারিনী। হাত পাততে শেখায়। আসলে কোন কোন রতিসুখের পরে প্রকৃত মানুষ সন্ন্যাস নিয়ে ফেলে।

গাছেদের সংসার

তুমি তখন ওপাড়াতে থাকতে
প্রাত্যহিক-ই রোদ এসে ধুইয়ে দিত
তোমাদের উঠোন
আমার বেহিসেবি পা যেন কিনে ফেলেছিল
তোমার বাড়ির পথ
অজুহাত বাধ্য করাত তোমাকে
নিচে নেমে আসতে কয়েকবার
তারপর অহংকার আমাদের ফিরিয়ে দিয়েছিল
আমার তখন দেশ হারানোর আপশোষ
শূন্য হাতে ফেরার পথে
যে চারাগাছ রোপন করেছিলাম পথের ধারে
এত বছর পর ফিরে দেখি সেও আজ সংসারিণী
আমার আর ঘর বাঁধা হল না
শুনেছি তুমিও নাকি ভীনদেশেতে একাই থাকো
আমরা এখন কেউ থাকি না প্রায়
অথচ দেখ আমাদের না থাকাটা
কেমন থাকা হয়ে রয়ে গেছে গাছেদের সংসারে।

ছোঁয়াচে অভিমান

বটের দেহ থেকে এলায়ে পড়েছে বৃক্ষমূল খাতার উপর। মাটির স্পর্শ পেতে খানিক দেরি। অন্তরের পর্ণমোচী রোদ সেজে উঠেছে তোমার জন্য। একটু বসো আমাদের এই অচলায়তনে। জানালার ফাঁদে আটকে পড়েছে ধুলোবালি। আড়াআড়িভাবে মেঘ নেমে আসে আমাদের ছোঁয়াচে দূরত্বে। একটা লাজুক হাওয়া আমায় দেখে মুখ লুকিয়ে নেয় পর্দার আঁচলে। নিজস্ব মজলিসের পানপাত্রে তুমি রোজ বিষাদ মেখে রাখ। দেখে যাও, রাতজাগা ইচ্ছেগুলো সবে হাই তুলছে উঠোনপাড়ে। বিবাগী সন্ধেগুলো পথে নামে মেপে নিতে শহরের অভিমান।
এতটা সময় পেরিয়ে এলাম। চলে যাবে? যেও। হে শাশ্বত! বেলা থাকতেই চলে যেও।

নাগরিক ফিরে আসা

তবে তাই হোক। অক্ষরের আঁচড়ে আঁচড়ে আর জাগাব না
সিলিকন সরণিতে দিশাহীন সারমেয়র মত
রাতজাগা আর কোন গলি খুঁজবে না
কথারা একদিন থেমে যায় এভাবেই…
তারপর ?
হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে ঘুম ভাঙে একদা সভ্যতার
দেখি থেমে থাকতে থাকতে বড় হচ্ছে পায়ের নিচে ঘাস
এবার তাহলে বেড়িয়ে পড়ি…

দারুচিনি দ্বীপের মোহ আপাতত কেটে যাওয়া ভাল
তোমাকে চিনেছি যতটা তার চেয়েও বেশি অচেনা
তোমার সংসদীয় প্রস্তাবনা
তোমাকে বোঝা বড় শক্ত
এখন ধুলোর সঙ্গে সহবাসে থাকি
সময় হোল প্রতিশ্রুতি ফিরিয়ে নেবার
অল্প দূরে কোলাহল হাতছানি দেয়….

এইমাত্র মুখাগ্নি করে ফিরছে যে ছেলেটি
তারও মুখে দেখ অদ্ভুত নাগরীক প্রশান্তি..

নাবিক ও মোহনার হরিধ্বনি

যারা মোহনার দিকে হেঁটে গেল
যারা আজ সুখী, যথার্থ প্রেমিক
তাদের দেখে আর ভেতরের পতঙ্গগুলি বেরিয়ে আসে না
আমরা যারা ভালবাসা পাব বলে রোজ
একই পংক্তিতে বসে ভোজ নেই
তাদের মুখে কবেকার হরিধ্বনি

আমাদের কোন চেনা হাত নেই
পরিযায়ীর মত চঞ্চু দিয়ে তেষ্ণা মেটাই

কার উঠোনে কে রেখে গেল সন্ধ্যা-সঙ্গীত
পরিত্যক্ত অন্তরমহল তা জানে না
এই অসুখী আকাশ দিয়েছে তাদের দীর্ঘ উড়ানের ছাড়পত্র

দলছুট নাবিকের কোন দেশ নেই। কোন দেশ থাকতে নেই
নোঙর ফেলার শব্দে তাদের আর ঘুম ভাঙে না

আমরা কয়েকজন যারা সুখ খুঁজতে গিয়ে নিরুদ্দেশ হলাম
জীবন অববাহিকায় বসে তারা এখন জেনে গেছে
অ-সুখ-এর মধ্যেই প্রকৃত সুখ নিহিত আছে।
আরও পড়ুন: রবিবারের ছোটগল্প পরিচয় লিখেছেন সুদীপ্ত রায়

Check Also

নেতাদের ছবি

ভাইরাল হওয়া ছবিগুলির সত্যতা সম্পর্কে কখনও কি জানতে চেষ্টা করেছেন? না জানলে জেনে নিন

সবার খবর, ওয়েব ডেস্ক: আপনারা যে সব ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখতে পান বা শেয়ার করেন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *