Breaking News
Home / রবিবারের আড্ডা / গল্প / রবিবারের ছোটগল্প পাখি হওয়ার সাধ লিখেছেন চন্দ্রশিলা ছন্দা

রবিবারের ছোটগল্প পাখি হওয়ার সাধ লিখেছেন চন্দ্রশিলা ছন্দা

ছোটগল্প

পাখি হওয়ার সাধ

চন্দ্রশিলা ছন্দা

রবিবারের ছোটগল্প

Illustration: Preety Deb


জানালার গ্রীলে মুখ লাগিয়ে সবুজের উদাস হয়ে বসে থাকা দেখে মা কাছে এসে চুলগুলো এলোমেলো করে বললেন, আমার বাবুটা আকাশের দিকে তাকিয়ে কী ভাবছে এমন করে? বাবুটি কি তার মাকে সে কথা বলবে? সবুজ তখনো চুপ! যেন তার ধ্যান ভাঙছে না। মা আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে বললেন, বাবুদের কিন্তু সবচে কাছের বন্ধু তার বাবা-মা। মা-বাবাকে মনের সব কথা বলতে হয়। তাহলে দেখবে অনেক প্রশ্নের উত্তর বাবুরা পেয়ে যায়। অনেক জটিলতার সমাধান মা-বাবারা খুব সহজেই করতে পারে। কথাগুলো সবুজ আগেও মা ও বাবার কাছ থেকে শুনেছে। কিন্তু কেন যেন আজ সবুজের মন খুব বেশি খারাপ। সে জানে, মাকে বলেও কোন লাভ নেই। তবু বললো, জানো মা, আমার খুব পাখি হতে ইচ্ছে করে। দেখো না, নীল আকাশে পাখিগুলো কী সুন্দর উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। আর আমি ঘরের ভেতর বন্দি। আবার একটু পরে বলবে, বাবু পড়তে বসো। অন্য দিনগুলোতে স্কুল থেকে এসে খেয়ে উঠেই যেতে হয় কোচিং এ। আর ছুটির দিন দুপুরে বলবে ঘুমো। বিকেলে বলবে পড়তে বসো। সুজের চোখ ছল ছল করে ওঠে। কিন্তু মা সে সব কথায় কান না দিয়ে যেন মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, তুই তো আমার পাখিরে বাবু। না। আমি শুধু তোমার পাখি হতে চাই না। আমি সত্যি কারের পাখি হতে চাই। শালিক চড়–ই ময়না টিয়া যেমন হয়, তেমন পাখি। মা সবুজকে আদর করে বললেন, লেখাপড়া শিখে বড় হও। তখন তুমি পাখি হতে পারবে সোনা। সবুজ এবার সত্যিই কেঁদে ফেললো। আর কাঁদতে কাঁদতেই বলতে লাগলো, তুমি বাবা দাদু তোমরা সবাইতো অনেক বড় হয়েছো। দাদুর তো চুল পেকে গেছে। দাঁত পড়ে গেছে তবুও পাখি হতে পারেনি। তাহলে আমি কী করে পাখি হবো মা? মা আদর করে চোখ মোছাতে মোছাতে বললেন, বড় হয়ে তুমি যখন এরোপ্লেন নিয়ে আকাশে উড়বে তখন বুঝবে। তবুও সবুজের মন আজ কিছুতেই শান্ত হয় না। ব্যাপারটা মা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারেন। বুঝে বললেন, চলো এক্ষুনি। আমরা আজ মা ছেলে বাইরে গিয়ে তোমার পছন্দের পিৎজ্জা খেয়ে আসি। আজ দুপুরে কোচিং বাদ। পড়া বাদ। মজা না ? গো গো… ঝটপট কাপড় বদলে এসো। সবুজের যেন কিছুতেই বিশ^াস হয় না। মা এটা সত্যি বলছে? না কি তার পরীক্ষা নিচ্ছে! কিন্তু যায় হোক না কেন, ভেতরে ভেতরে সবুজ একটা চাঞ্চল্য অনুভব করলো। সেটা সে মুখে কিছু না বললেও চোখ মুখের কোথায় যেন একটু আভা ছড়ালো। মা এবার নিজের আলমিরা থেকে কাপড় বার করতে করতে বললেন, বাবু এখনো বসে আছো? সবুজও কম নয়। সেও মাকে একটু বাজিয়ে দেখার জন্য বললো, কিন্তু মামনি অনেক যে পড়া বাকি! কোচিং এ না গেলে যে পরের দিন স্যার বকা দিবেন। তাছাড়া তুমিই তো বলো। ঠিকমত না পড়লে আমি অন্যদের থেকে পিছিয়ে যাবো। হ্যা বলি, কিন্তু মাঝে মাঝে একটু আধটু ফাঁকি দিলে মস্ত ক্ষতি হবে না। তাছাড়া আমি কি তোমার তেমন মা? যে, কোন সময়ই তোমার ভালো লাগা- খারাপ লাগাকে পাত্তা দেই না? মনে মনে ছোট্ট সবুজ ভাবে। তাই তো। আমার মামনি অন্য সবার মামনির থেকে আলাদা। স্কুলে যখন পরীক্ষা শুরু হয় তখন পরীক্ষা শেষ করে ক্লাস থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে বন্ধুদের মাগুলো তাদের ছেলের সাথে শুরু করে দেন, এটার উত্তরে কী লিখেছো? এটা কী হবে? এটা তো ভুল হলো। ওটার বানানটা বলো দেখি। অংকের উত্তরগুলো কেন কোয়েশ্চিনে লিখে আনোনি ইত্যাদি … …. আমার মামনি কখনোই তা করেনি। এমন কি ক্লাস ওয়ানের ফাইন্যাল পরীক্ষার পরেও না। আমি তো আমার বন্ধুদের অবস্থা দেখে ভয়ে অস্থির যে, আমাকেও এবার মার সামনে সারা রাস্তায় মুখে মুখে আবারও পরীক্ষা দিতে হবে। কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো, শুধু ক্লাস থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে মা আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, বাবু কেমন হলো পরীক্ষা? ঠিকমত সব লিখতে পেরেছো তো? হ্যা মামনি। কত মার্ক ছেড়ে এসেছো? কিচ্ছু ছাড়িনি। সব পেরেছি। ব্যাস। মা খুশি হয়ে আদর করে চুমু খান। তারপর অন্যসব কথা বলতে বলতে বাসায় চলে আসি। বাসাতেও মা কখনো বই খাতা নিয়ে উত্তর মিলাতে বসে যেতেন না। মামনির এমন নির্লিপ্ত ভাব দেখে প্রথম প্রথম ভয়ও পেতাম। মা রাগ-টাগ করে আছে নাকি। কিন্তু না। প্রতিটা পরীক্ষার পর দেখি মামনি এই রকমই করছেন! পরে মামনিকে অন্য আন্টিদের মাঝে বলতে শুনেছি, বাচ্চারা যা লিখে রেখে এসেছে, তা তো স্যারেরা রেজাল্ট দেয়ার আগে খাতা দেখাবেন। আর ওরা যা লিখে রেখে এসেছে সেই লেখাকে তো আর উল্টানো যাবে না। তাহলে কেন শুধু শুধু বাচ্চাগুলোকে একই পরীক্ষা দুবার নেয়া? ভুল হলে মন খারাপ হবে। পরের পড়াগুলো খারাপ হবে। তারচে থাক না। সবুজ মার কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে হ্যালো চিকেনের সামনে চলে এসেছে! আজকাল প্রায় সব খাবার রেষ্টুরেন্টের ভেতরে প্লে-জোন থাকে। সেখানে আরো সব অচেনা অজানা বেবী বয়েজরা থাকে। অচেনা হলেও ওইটুকু সময়ের মধ্যেই আবার বন্ধুত্বও হয়ে ওঠে তাদের মধ্যে। মায়েরা খাবার অর্ডার করে বসে থাকে। আর বাচ্চারা খেলে। তাই এই খাবারের দোকানগুলো সব বাচ্চাদেরই প্রিয় একটা জায়গা। এই জায়গাগুলোয় এলেই তারা উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। খাবার শেষ করে মা-ছেলে রিক্সা করে আবার গেলো সামরিক জাদুঘরের ভেতরে। ছুটির দিনগুলোয় প্রচন্ড ভিড় হয় এই সব বিনোদন স্পটগুলোয়। কিন্তু আজ মঙ্গলবার হওয়ায় একদম সব ফাঁকা। আবার আবহাওয়াও না শীত না গরম। নামমাত্র মূল্যে টিকেট কিনে ভেতরে ঢুকে মা-ছেলে মুগ্ধ। এতো চমৎকার সবুজ আর কত কিছু! মস্ত বড় বড় বিমান, জেট বিমান, জাহাজ, ফুলের বাগান আবার কোথাও কোথাও হাতি হরিণ বানানো আছে। কিছু রাইডও আছে। সারা বিকেল সবুজ ভীষণ মজা করলো। নৌকার মত একটা ভয়ঙ্কর রাইডে তারা উঠেছিলো। ওটা দুলতে দুলতে এক সময় সম্পূর্ণটা উল্টো হয়ে যায়। রোলার কোষ্টারের থেকেও ভয়ঙ্কর। কেউ কেউ বমিও করে ফেলেছে। সবুজ মনে মনে মামনির উপর খুবই কৃতজ্ঞ হলো এমন একটা দিন উপহার দেয়ার জন্য। তারপর সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বললো, মামনি থ্যাঙ্কস। তুমি আমার খুবই ভালো আর লক্ষী একটা মা। মামনি মিষ্টি করে হেসে বললেন, এখন বলো তো বাব?ু পাখি হলে বেশি ভালো হতো? নাকি মানুষ হয়ে বেশি ভালো হয়েছে? বাবু ভাবলো তাই তো! পাখির তো শুধু উড়ে উড়ে বেড়ানো। আর পোকামাকড় খুঁজে খাওয়া। কিন্তু মানুষের জীবন কত রকমের হয়। মানুষ একটু কষ্ট করে লেখাপড়া শিখে বাবার মত একটা ভালো চাকরী করলে নিজের ইচ্ছেমত সুন্দর জীবন পেতে পারে। সবুজ ভাবলো, মামনি ঠিকই বলেছেন। বড় হয়ে এ্যারোপ্লেনের পাইলট হলে পৃথিবীর কত দেশ কত জায়গায় পাখির মত উড়ে উড়ে যাওয়া হবে। কত সুন্দর সুন্দর বিষ্ময়কর না দেখা জিনিসও দেখা হবে। তাই সে ঠিক করলো এখন থেকে খুব ভালো করে পড়ালেখা করবে। প্রতিদিনের পড়াগুলো আগে তৈরী করে তারপর ইচ্ছে মত মারসাথে বেড়াতে যাবে। ভাবতে ভাবতে কখন যে সবুজ গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো।
Read More: বাপ্পাদিত্য দাসের সাক্ষাৎকার : প্রথম দশকের তরুণ কবি বাপ্পাদিত্য দাসের মুখোমুখি শূন্য দশকের কবি জুবিন ঘোষ

Check Also

খাতা ৪

ধারাবাহিক উপন্যাস খাতা লিখেছেন দেবশ্রী চক্রবর্তী : পর্ব- ৪

ধারাবাহিক উপন্যাস খাতা দেবশ্রী চক্রবর্তী Illustration: Preety Deb তিতিরের মনে হল সে বহুক্ষণ এখানে থেকেও …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *