Breaking News
Home / রবিবারের আড্ডা / গল্প / রবিবারের ছোটগল্প দৃষ্টি লিখেছেন নীপবীথি ভৌমিক

রবিবারের ছোটগল্প দৃষ্টি লিখেছেন নীপবীথি ভৌমিক

ছোটগল্প

ছোটগল্প

Illustration: Anirban Paul

গল্পটা যে ঠিক কোথায় শেষ হয়েছিলো তা ঠিক মনে নেই মিস্টার মুখার্জি-রীণা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললো। আজ আর কলেজ যাইনি রীণা। দুদিনের ছুটি নিয়েছে। অবশ্য আজকাল মাঝে মাঝেই বিরক্ত হয়ে পড়ে এই রোজকার ধরাবাঁধা রুটিন লাইফে। লতিকা বেশ বুঝতে পারে রীণার চোখ মুখের চিহ্ন দেখে তা।

কামিং-ও হ্যাঁ বল, তোর কাজ শেষ? যাওয়ার সময় রান্নাঘরের আলোটা নিভিয়ে দরজাটা ভালো করে টেনে দিয়ে যাস। আজকাল যা বিড়ালের উপদ্রব বেড়েছে!আর ভালো কথা, কাল আসার সময় অল্প কিছু সবজি কিনে আনিস তো, ভাবছি কালকের রান্নাটা আমিই করবো। খাবার আনাবো না বাইরের থেকে, কত্তদিন যে হলো নিজের হাতে কিছুই বানাইনি! এক নিশ্বাসে সব কথা লতিকাকে নির্দেশ দিয়ে গেলো রীণা।

লতিকা এ বাড়িতে আছে তা প্রায় বছর বারো হবে, সেই রীণার বাবা মায়ের আমল থেকে। লতিকার মা’ই কাজ করতো তখন। ছোট্ট লতিকা আসতো ওর মায়ের সাথে, রীণাও বেশ দিদি দিদি ভাব নিয়ে লতিকার সাথে কখনো স্কুল স্কুল খেলতো আবার কখনও দারোগা সেজে চোর পুলিশ খেলা খেলতো। তবে, মেয়েদের সহজাত খেলা বলতে গেলে যা, সেই পুতুল খেলা কিংবা রান্নাবাটি খেলা…না কোনোদিনই তা সম্ভব হয়নি বরাবরের ডানপিটে স্বভাবের রীণার পক্ষে। বরং সে অনেক বেশি সপ্রতিভ ছিল দারোগা সেজে চোর পুলিশ খেলায়।

-হ্যাঁ, মিস্টার মুখার্জি, যে কথা বলতে চাইছিলাম আপনাকে, আপনি বরং খুব ভালো করে বাবার সমস্ত তথ্য ও লাইব্রেরীটা ঘেঁটে দেখুন।আসলে ওই একটা লাইন, জানেন তো, আজকাল বড় নাড়া দেয় মনকে-একটু অন্যমনস্ক ভাবেই রীণা বলে গেলো মিস্টার শ্যামাপদ মুখার্জিকে।

অধ্যাপক, সাহিত্যক, নাট্যকার বিধান ভট্টাচার্যের সর্ব সময়ের ছায়াসঙ্গী ছিলেন শ্যামাবাবু। এমনকি, অর্ন্তমুখী স্বভাবের বিধান বাবু সম্পর্কে যতটা না ওনার স্ত্রী এবং পুত্র কন্যা জানতেন, তার থেকেও অনেক বেশি খোলামেলা ছিলেন ওনার প্রিয় পাত্র শ্যামের কাছে।বিধান বাবুর একমাত্র পুত্র রাহুল তাই সারাক্ষণ মজা করে মিস্টার মখার্জিকে, ’বাবার লকার রুম’।

-ওকে ম্যাম, এখন আসি, হয়ে যাবে, চিন্তা করবেন না। আগামী দশ দিনের মধ্যেই সমস্ত ডকুমেন্টস আপনার হাতে জমা পড়ে যাবে। আসি এখন__প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস সহকারে রীণাকে আশ্বস্ত করে মিস্টার মুখার্জি কথা দিয়ে গেলেন।

এই সময় এই দিকটা বড়ই একাকীত্বের ছোঁয়া নেমে আসে শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে গাছপালায় ঢাকা ছোট্ট এই বন বাংলোর মতো বাড়িটায়। কতগুলো কাঠবিড়াল আর বেশা কতগুলো নাম না জানা পাখিদের হাঁক ডাক ছাড়া আর তেমন কিছুই শোনা যায় না এই সময়টাতে। তবে দিনের অন্যভাগ ও যে খুব বেশী করে উচ্চমাত্রার শব্দের সাথে ডুবে থাকে তাও নয়। আওয়াজ বলতে সকাল সন্ধ্যায় কয়েকটা টাউন বাস আর স্কুল বাসের আওয়াজ, তা ছাড়া আর তেমন কিছুই না। আর সেই সুযোগে সারাদিনের ক্লান্ত অবসন্ন দুপুরটা একটু একা থাকার বাসনায় যেন উন্মুখ হয়ে ওঠে। তবে এই একাকীত্বটা বোধহয় সবারই জীবনে ভীষণ ভাবে প্রয়োজন, তা সে জীব কিংবা জড় যেই হোক না কেন! বাবা মারা যাওয়ার দু’বছরের মাথায় মা স্বাতী দেবীও গত হন।অবিবাহিত রীণা কলেজ সামলিয়ে তাই এখন ডুবে থাকে তার নিজস্ব মনন জগতে, যেখানে সৃষ্টি আর সাহিত্যের অবাধ বিচরণ। কোনো দরজা নেই তাদেরকে আটকে ঢোকার পথ রুদ্ধ করতে পারে। একমাত্র ভাই, রাহুল আজ বছর ছয় হলো মুম্বাই তে সেটইল। তবে, গোবিন্দ নগরের এই এদো জঙ্গল জায়গা তার কোনো কালেই ধাতে সয় না। তাই, চাকরী সূত্রে প্রথম প্রথম অফিস বাংলোতে থাকলেও এখন রাহুল সেই বাংলোর তুলনায় আরো অনেক বেশি সুবিধা যুক্ত নিজস্ব বাড়িতেই থাকে স্ত্রী অরুণিমা কে নিয়ে। এদিকে আসা যাওয়ার পর্ব বলতে গেলে উঠেই গিয়েছে। মাঝেমধ্যে অফিসের কোনো কাজ থাকলে কলকাতায়, কিছুটা সময়ের জন্য একটু ঘুরে যাওয়া আর কি। তাই সেই অর্থে রীণা সারাদিনই প্রায় একা। যেমন ভাবে রীণাও কলেজে বেরিয়ে যাওয়ার পরে এই বাড়িটা, বইয়ের লাইব্রেরীটা একা থাকে …

ঘরের আলোগুলো নিভিয়ে দিয়ে রীণা দক্ষিণ দিকের ছোট্ট ব্যালকনিতে এসে বসলো। এই দক্ষিণ দিকটা বড় টানে ওকে। মা বড় সখ করে এই বাগানটা তৈরী করেছিলেন নিজের হাতে। কিনা গাছ নেই সেখানে। দেশ বিদেশ থেকে আনা নানান ধরণের ফুল, পাতা, ফল সবই আছে সেই বাগানে। মা স্বাতী দেবীর মৃত্যুর পর বাগান সামলানোর দ্বায়িত্ব এখন রীণার। ছোট্ট চিনা মাটির পটটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে রীণার দৃষ্টি বোধহয় কোথাও ধাক্কা খায় ক্যাকটাসের অজস্র রুক্ষ কাঁটায় গজিয়ে ওঠা হলুদ ফুলের দিকে। আজ ওর আবৃত্তির ক্লাসের ছাত্র ছাত্রীদের ছুটি। কলেজের পর বাড়ি ফিরে এসে আবৃত্তি আর নাটক, এই সমস্ত নিয়েই রীণার জীবন।এত কাজ সামলিয়েও কখনো একবিন্দু বিরক্ত হয়নি সে। সমান তালে চলতে থাকে কখনো শব্দের সঠিক উচ্চারণ শেখনো, কখনও সুর লয়ে ছন্দ মিলিয়ে কবিতাকে যথাযথ ভাবে পরিবেশন করার শিক্ষা, আবার কখনো বা তার নাট্য রূপ দেওয়া।খুব ভালোবাসে বাচ্চাগুলো ওদের রীম দিদিকে। ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চা ছেলে মেয়েগুলোর শব্দ ছন্দে সারা বাড়ি মুখরিত হয়ে ওঠে, রীণার চোখ মুখে যেন এক অনাবিল শৈশব খেলে যায়। শুধুমাত্র ছোটোরাই নয়, বড়দেরও রীম দিদি খুব কাছের বন্ধু। রীম দিদিরও ওরাই সবকিছু। ওরাই বন্ধু।
হ্যাঁ, এই রীম দিদি নামটাই যত্তো এলোমেলো। বাবাকে তো সেভাবে কখনো পাইনি রীণা, তাই মায়ের হাত ধরে যখন সে আবৃত্তির ক্লাসে যেতো, দেখতো কিভাবে ওর সমবয়সী ছেলে মায়েরা বাবা মাকে কাছ থেকে পায়। প্রথম প্রথম খুবই মনমরা হয়ে থাকতো সে, বাড়িতেও কাউকেই কিছু বলত না অর্ন্তমুখী স্বভাবের রীণা। মা স্বাতী ভট্টাচার্য এতো বড় মানুষের স্ত্রী হলে কিহবে, উনি ছিলেন আর পাঁচটা বাঙালি গৃহবধূর মতন।দোদণ্ডপ্রতাপ বিধান বাবুর কথাই এ বাড়িতে শেষ কথা।

সৌমেনের বাবা মায়ের খুব ভালোবাসার পাত্রী ছিলো রীণা। আবৃত্তি ক্লাসের এক কোণে দাঁড়িয়ে অন্তর্মুখী রীণা যখন নীরবে একা একা দাঁড়িয়ে ছবি এঁকে যেতো রাস্তার আলোছায়া মাখা শব্দ আর পথচারীদের সাথে, তখন থেকেই রায় পরিবারের ভীষণই আদরের হয়ে উঠে সে। আসলে, জন্মের মাত্র আট দিনের মাথায় প্রবল জ্বরে তাদের একমাত্র মেয়েকে চিরতরে হারায়। ধীরে ধীরে দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্কের গভীরতা বাড়তে থাকে, সৌমেন আর রীণা বলতে গেলে প্রায় সমবয়সী। সেই কারণেই হয়তো ওদের বন্ধুত্ব ও ছিলো এত গাঢ়।হ্যাঁ, ব্যাস এইটুকুই! শুধু একটা নির্ভেজাল, খাঁটি বন্ধুত্ব! আসলে রীণা বরাবরই একটু অন্য মানসিকতার। আর পাঁচটা মেয়ের থেকে একদমই আলাদা। ওর কাছে প্রতিটি সম্পর্কই আলাদা ভাবে সুন্দর। সম্মানের সাথে তাকে লালন পালন করতে হয় নিজের ভিতর।তাই সে নিজে মেয়ে বলে যে শুধু মেয়েরাই তার ভালো বন্ধু হবে তা কখনই নয়। অবশ্য এই মানসিকতা তার বাবার কাছ থেকে পাওয়া। কিন্তু সৌম্য যে ওই কনসেপ্টে বিশ্বাসী নয় কখনও, সৌম্যর বাবা মাও চেয়েছিলেন চার হাত এক করে বেঁধে দিতে। রীণার মায়ের যে এতে খুব একটা অমত ছিলো তাও না, বরং এতে উনি খুশিই হতেন আরো। চেয়েছিলেন রীণা আর সৌম্যর নিজেদের একটা পরিবার গড়ে উঠুক। কিন্তু রীণার চোখে যে সৌম্য তখন শুধুমাত্র একজন ভালো বন্ধু ছাড়া আর কিছুই নয়। কখনই রীণা আসলে নিজেকে পরিবারের বন্ধনে বাঁধায় সেভাবে বিশ্বাসী ছিলনা।
ধুর কেন যে ছুটি দিলাম আজ ওদেরকে, কি যে করি আজকাল, নিজেই জানি না-পুরোনো পারিবারিক অ্যালবাম ঘেঁটতে ঘেঁটতে নিজের ওপর নিজেই বিরক্ত হয়ে রীণা বলে চলল মনে মনে। এই একা একা বাড়ি ঘর কি আর ভালো লাগে এই বয়সে? সেই কলেজ, ঘর, চায়ের কাপ, লতিকা আর দক্ষিণের একফালি বারান্দা! বড় একা লাগে ভীষণ, ভীষণই একা লাগে আজকাল তার। অথচ, বারান্দার দৈর্ঘ প্রস্থ মাত্র একফালির হিসাব…
হ্যালো, হ্যালো রীণা ম্যাম, আমি শ্যামা বলছি দিদি। আপনার বাবার অসমাপ্ত গল্পটা খুঁজে পেয়েছি দিদি। গল্পের নাম রেখেছিলেন পরিবার…যদিও কাজটা উনি সম্পূর্ণ শেষ করে যেতে পারেননি, তবুও গল্পের নামে অনেক কাটা ছেড়ার পর এই নামটাই তিনি বোধহয় ফাইনাল করেছিলেন। ল্যান্ডফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসলো মিস্টার মুখার্জির এক নিঃশ্বাসে বলে যাওয়া কথাগুলো।
থ্যাঙ্কু মিস্টার মুখার্জি। আপনি নিয়ে আসুন সমস্ত ডকুমেন্টস, আমিই শেষ করবো বাবার অসমাপ্ত কাজ।আমার পরবর্তী নাটক হবে সাহিত্যিক বিধান ভট্টাচার্যের লেখা পরিরার গল্পের উপর-রীণা প্রবল উচ্ছাসে নিজেকে প্রকাশ করলো।
তবে কি রীম সত্যিই আজ পরিবার চায় নিজের একটা? সৌম্যকে শুধুই বন্ধু ভাবে আজও রীণার একাকীত্ব মন, না কি তার থেকেও বেশি কিছু। ভিতরের দৃষ্টিপথ তবে কি রুদ্ধ হয়েছিলো কোনো কারণে? নাকি তাকে পড়ার চেষ্টাই করেনি নিজের অযাচিত কঠোর মানসিকতা দিয়ে? প্রশ্নে ঘিরে ধরে বারবার এই চল্লিশ উর্ধ্ব মন ও শরীরকে।
ব্যালকনির ইজি চেয়ারটা পরে থাকে নিঃসঙ্গ বাস্তবতায়। রীণার মনন জগৎ এখন পরিবারের সাথে গল্প ছায়ায় ভেসে যাওয়া আলপথ। সৌম্য কি আজও মনে রেখেছে আমাকে। ওর রীম কে?-বড় জানতে ইচ্ছা করে রীণার আজ।
আরও পড়ুন: রবিবারের ছোটগল্প ল্যান্ডফোন লিখেছেন তাহমিনা শিল্পী

Check Also

গল্প

রবিবারের ছোটগল্প আলোর ঘ্রাণ লিখেছেন দেবপ্রিয়া সরকার

ছোটগল্প Illustration: Preety Deb রাত তখন দুটো কী তিনটে হবে। অভ্যেস বশে পাশ ফিরে মেহুলকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *